মেক্সিকোর শীর্ষ মাদকসম্রাট এল মেনচো সামরিক অভিযানে নিহত, যুক্তরাষ্ট্রের পুরস্কার ঘোষণা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন
মেক্সিকোর মাদকসম্রাট এল মেনচো নিহত, যুক্তরাষ্ট্রের পুরস্কার সত্ত্বেও দীর্ঘদিন আড়ালে

মেক্সিকোর শীর্ষ মাদকসম্রাট এল মেনচো সামরিক অভিযানে নিহত, যুক্তরাষ্ট্রের পুরস্কার ঘোষণা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন

মেক্সিকোর সরকার ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে লড়াইয়ে লাশের পাহাড় গড়ে এক রক্তাক্ত অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছিলেন নেমেসিও ওসেগুয়েরা, যিনি অপরাধজগতে এল মেনচো নামে বেশি পরিচিত। গতকাল রোববার মেক্সিকোর সেনাবাহিনীর এক বিশেষ অভিযানে নিহত হয়েছেন এই শীর্ষ মাদকসম্রাট, যা মেক্সিকোর অপরাধজগতের এক বর্ণাঢ্য ও বীভৎস অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের দেড় কোটি ডলার পুরস্কার ও দীর্ঘদিনের আড়ালে থাকা

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এল মেনচোকে ধরিয়ে দিতে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার পুরস্কার ঘোষণা করে নিজেদের ওয়েবসাইটে তাঁর পোস্টার প্রকাশ করেছিল। তবে বছরের পর বছর ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন তিনি, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হয়।

সিজেএনজি কার্টেলের প্রধান ও ফেন্টানিল পাচারের মূল হোতা

সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা এল মেনচো ছিলেন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অপরাধী চক্র জালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেলের (সিজেএনজি) প্রধান। তিনি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ মাদক চক্র সিনালোয়া কার্টেলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এক সুবিশাল অপরাধ সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে প্রাণঘাতী মাদক ফেন্টানিল পাচারের মূল হোতা হিসেবে অভিযুক্ত ছিলেন তিনি।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বিশেষজ্ঞের মন্তব্য

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের নিরাপত্তাবিশেষজ্ঞ ভান্দা ফেলবাব-ব্রাউন বলেন, সিনালোয়া কার্টেলের শীর্ষ নেতাদের পর এল মেনচোই ছিলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে গত কয়েক দশকের সবচেয়ে বড় পুরস্কার। এটি সত্যিই বিস্ময়কর, তিনি দীর্ঘ সময় ধরে মেক্সিকো ও মার্কিন বাহিনীর হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছিলেন।

এল মেনচোর অপরাধজগতের বিস্তার ও কুখ্যাতি

মেক্সিকোর কারাবন্দী এল চাপো গুজমানের পর মেনচোই ছিলেন দেশটির সবচেয়ে প্রভাবশালী মাদকসম্রাট। তিনি মাদক ছাড়াও চোরাই জ্বালানি ব্যবসা, জোরপূর্বক শ্রম ও মানব পাচারের মতো অপরাধে জড়িত ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাঁস হওয়া অডিওবার্তায় তাঁকে চরম অশালীন ভাষায় সরকারি কর্মকর্তাদের হুমকি দিতে শোনা যেত, যা তাঁর কুখ্যাতি ছড়িয়ে দিয়েছিল।

জীবনী ও উত্থান

১৯৬৬ সালে মিশোয়াকান রাজ্যের এক দুর্গম ও দরিদ্র গ্রামে এল মেনচোর জন্ম। ছোটবেলায় কৃষিকাজ করতেন তিনি, পরে উন্নত জীবনের সন্ধানে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। সেখানে হেরোইন ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন, গ্রেপ্তার হয়ে জেল খাটেন এবং মেক্সিকোতে ফেরত পাঠানো হন। দেশে ফিরে পুলিশে যোগ দেন, কিন্তু অপরাধের নেশা তাঁকে ছাড়েনি। তিনি মিলেনিও কার্টেলে যোগ দিয়ে সিজেএনজি প্রতিষ্ঠা করেন।

রাজনৈতিক প্রভাব ও সামাজিক সুরক্ষা

কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞ এদগার্দো বুসকালিয়া বলেন, এল মেনচো রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক প্রচারে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করতেন, যা তাঁকে এক ধরনের সামাজিক সুরক্ষা দিয়েছিল। ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় মেক্সিকোর সরকার যখন হিমশিম খাচ্ছিল, তখন এল মেনচোর সশস্ত্র ক্যাডাররা সাধারণ মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেছিল।

মৃত্যুর প্রভাব ও ভবিষ্যৎ উদ্বেগ

এল মেনচোর এই রক্তাক্ত বিদায় মেক্সিকোর মাদক যুদ্ধের ইতিহাসে এক বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে তাঁর বিশাল সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী কে হবেন এবং কার্টেলের পাল্টা প্রতিক্রিয়া কেমন হবে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগে রয়েছে প্রশাসন।