তালেবানের কঠোর দাড়ি আইনে আফগান নরসুন্দরদের আতঙ্ক, কারাভোগের ঝুঁকি
আফগানিস্তানে তালেবান কর্তৃপক্ষের কঠোর ইসলামি আইনের প্রয়োগ জোরদার হওয়ায় পুরুষদের দাড়ি ছোট করে ছাঁটলে নরসুন্দরদের এখন কারাভোগ করতে হতে পারে। ‘ভালো কাজের আদেশ ও খারাপ কাজের নিষেধ’ মন্ত্রণালয়ের নতুন আদেশ অনুযায়ী, দাড়ি এক মুষ্টির চেয়ে বড় রাখা আবশ্যক করা হয়েছে, যা আগের নির্দেশনাকে আরও কঠোর করেছে।
মন্ত্রীর বক্তব্য ও টহল কার্যক্রম
মন্ত্রী খালিদ হানাফি বলেন, ‘শরিয়াহ বা ইসলামি আইন অনুযায়ী জনগণের বাহ্যিক অবয়ব নিশ্চিতে দিকনির্দেশনা দেওয়া সরকারের দায়িত্ব।’ তিনি উল্লেখ করেন, ভালো কাজের আদেশ প্রচারে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের ইসলামি ব্যবস্থা বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নিয়ম মানা হচ্ছে কি না তা যাচাইয়ে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এখন শহরের রাস্তায় রাস্তায় টহল দিচ্ছেন, যা নরসুন্দরদের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করেছে।
নরসুন্দরদের অভিজ্ঞতা ও আটক
দক্ষিণ–পূর্ব গজনি প্রদেশের ৩০ বছর বয়সী এক নরসুন্দর জানান, তাঁকে তিন রাত আটকে রাখা হয়েছিল কারণ তাঁর এক কর্মচারী এক গ্রাহকের চুল ‘পশ্চিমা ধাঁচে’ কেটেছিলেন। তিনি বলেন, ‘প্রথমে আমাকে একটি ঠান্ডা হলরুমে রাখা হয়েছিল। পরে আমি মুক্তির জন্য জোরাজুরি করলে তাঁরা আমাকে একটি শীতল (শিপিং) কনটেইনারে পাঠিয়ে দেন।’ তবে শেষ পর্যন্ত কোনো অভিযোগ ছাড়াই তাঁকে ছাড়া দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু টহল দল পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি তাঁর গ্রাহকদের নিয়ে লুকিয়ে পড়েন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক নরসুন্দর বলেন, ‘বিষয় হলো, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কেউ তর্ক বা কোনো প্রশ্ন করতে পারেন না। সবাই তাঁদের ভয় পান।’ তিনি উল্লেখ করেন, কোনো ক্ষেত্রে নরসুন্দর ও গ্রাহক উভয়কে আটক করা হলেও গ্রাহকদের ছেড়ে দেওয়া হয়, কিন্তু নরসুন্দরকে আটকে রাখা হয়।
ধর্মীয় নির্দেশনা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রভাব
ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় আরও কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে, যেখানে দাড়ি কামানোকে ‘কবিরা গুনাহ’ বা মহাপাপ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় দাবি করে, দাড়ি কামানোর মাধ্যমে পুরুষেরা আসলে ‘নারীদের মতো হওয়ার চেষ্টা’ করছে। এই নিয়ম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়ও পৌঁছে গেছে, যেখানে শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের সতর্ক করে দিয়েছেন যে ইসলামি অবয়ব না রাখলে নম্বর কাটা হতে পারে।
ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও ব্যবসায়িক প্রভাব
কাবুলের ২৫ বছর বয়সী এক নরসুন্দর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘অনেক বিধিনিষেধ। নরসুন্দরের কাজ একধরনের ব্যক্তিগত (প্রাইভেট) ব্যবসা। দাড়ি বা চুল রাখা মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। যে যেভাবে চায়, সেভাবে কাটার সুযোগ থাকা উচিত।’ তবে মন্ত্রী হানাফি এ ধরনের যুক্তি নাকচ করে দিয়েছেন, বলেছেন এটি ‘ব্যক্তিগত পরিসরে হস্তক্ষেপ’ নয়।
২০২১ সালে তালেবান আবার ক্ষমতায় আসার আগে দেশটির বড় শহরগুলোর বাসিন্দারা নিজেদের পছন্দমতো পোশাক বা অবয়ব বেছে নিতে পারতেন, কিন্তু এখন দাড়ি কামানোর চল কমে আসায় ব্যবসায় মন্দা শুরু হয়েছে। এক নরসুন্দর বলেন, অনেক সরকারি কর্মকর্তা আগে সপ্তাহে কয়েকবার চুল–দাড়ি ছাঁটাতেন, কিন্তু এখন মাসে একবারও দোকানে আসেন না।
টহল ও নিয়মের কঠোর প্রয়োগ
কাবুলের ৫০ বছর বয়সী এক নরসুন্দর বলেন, নীতি পুলিশের টহল দল প্রতিদিন পরিদর্শনে আসে এবং সবকিছু পরীক্ষা করে দেখে। তিনি এক ঘটনার বর্ণনা দেন যেখানে এক কর্মকর্তা দোকানে ঢুকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘চুল এভাবে কাটলে কেন?’ নরসুন্দর বোঝানোর চেষ্টা করলে কর্মকর্তা বলেন, ‘না, ইসলামি ধাঁচে চুল কাটবে, ইংরেজি ধাঁচে নয়।’
জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর কুনার প্রদেশে মন্ত্রণালয়ের নিয়ম লঙ্ঘনের দায়ে তিন নরসুন্দরকে তিন থেকে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, যা এই কড়াকড়ির গভীরতা নির্দেশ করে।
