ইসরাইলে অতিরক্ষণশীল ইহুদি পুরুষদের দ্বারা নারী সেনাদের তাড়া: ২৩ জন গ্রেপ্তার
ইসরাইলে নারী সেনাদের তাড়া, ২৩ জন গ্রেপ্তার

ইসরাইলে অতিরক্ষণশীল ইহুদি পুরুষদের দ্বারা নারী সেনাদের তাড়া: উত্তেজনা ও গ্রেপ্তার

ইসরাইলে একটি উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনায় অতিরক্ষণশীল ইহুদি পুরুষেরা দুই ইসরায়েলি নারী সেনাকে তাড়া করেছেন। বেনি ব্রাক শহরের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, আবর্জনা ও উল্টে যাওয়া ডাস্টবিনে ভরা রাস্তার মধ্য দিয়ে ওই নারীরা দৌড়াচ্ছেন, আর পুলিশ কর্মকর্তারা তাদের চারপাশে সুরক্ষাবলয় তৈরি করছেন। পরে পুলিশ দ্রুত হস্তক্ষেপ করে নারী সেনাদের উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায়।

গ্রেপ্তার ও পুলিশের পদক্ষেপ

এ ঘটনায় ২০ জনের বেশি রক্ষণশীল ইহুদিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যা পরে ২৩ জনে পৌঁছেছে। পুলিশ জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে দাঙ্গা পুলিশ স্টান গ্রেনেড (শব্দ উৎপাদনকারী গ্রেনেড) ব্যবহার করা হয়েছে। এ ঘটনায় তিন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন এবং পুলিশের বেশ কিছু যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে একটি টহল গাড়ি উল্টে দেওয়া হয়েছে এবং একটি মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়া হয়েছে।

ঘটনার পটভূমি ও উত্তেজনার কারণ

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্সেসের (আইডিএফ) ওই নারী সেনারা সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার বাধ্যতামূলক সমন দিতে এসেছেন—এমন ধারণা থেকে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ইসরায়েলে অধিকাংশ ইহুদি নাগরিকদের জন্য সামরিক সেবা বাধ্যতামূলক হলেও অতি রক্ষণশীল ইহুদিরা দীর্ঘকাল ধরে এই নিয়ম থেকে অব্যাহতি পেয়ে আসছেন। সাম্প্রতিক সময়ে এই নিয়মে সংস্কার আনার পদক্ষেপ নেওয়ায় অতিরক্ষণশীল ইহুদিদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এ ঘটনাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে নিন্দা জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে নেতানিয়াহু বলেন, ‘এটি একটি চরমপন্থী সংখ্যালঘু গোষ্ঠী। তারা পুরো হরেডি [অতিরক্ষণশীল] সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করে না।’ নেতানিয়াহু আরও যোগ করেন, ‘আমরা অরাজকতা হতে দেব না। আইডিএফ সদস্য ও নিরাপত্তা বাহিনীর যাঁরা নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন, তাঁদের ওপর কোনো আঘাত সহ্য করব না।’ ইহুদি ধর্মীয় নেতারাও এই অশান্তির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছেন।

সামরিক সেবা বিতর্ক ও জনসংখ্যা প্রবণতা

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম কান জানিয়েছে, ওই নারী সেনারা অন্য এক সেনার বাড়িতে দাপ্তরিক পরিদর্শনে গিয়েছিলেন, ঠিক তখনই এ সংঘর্ষ শুরু হয়। গাজা যুদ্ধের সময় এই সামরিক সেবার বিষয়টি আরও বেশি বিতর্কিত হয়ে উঠেছে। ইসরায়েলি সরকার এখন এমন একটি আইন নিয়ে আলোচনা করছে, যার ফলে পূর্ণকালীন ধর্মীয় শিক্ষায় যুক্ত নন এমন অতিরক্ষণশীল পুরুষদের সেনাবাহিনীতে কাজ করা বাধ্যতামূলক হবে।

১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে ধর্মীয় স্কুল বা ‘ইয়েশিভায়’ পূর্ণকালীন ছাত্রদের সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়ে আসছিল। ১০ বছরের বেশি সময় আগে ইসরায়েলের উচ্চ আদালত ওই অব্যাহতিকে অসাংবিধানিক বলে রায় দিয়েছিলেন। গত বছর আদালত এ–সংক্রান্ত অস্থায়ী ব্যবস্থাগুলোর আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করেন, ফলে ওই সম্প্রদায়ের মানুষের জন্যও এখন সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়া বাধ্যতামূলক।

বর্তমানে অতিরক্ষণশীল বা হরেডি জনসংখ্যা ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশ। গত সাত দশকে ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যায় অতিরক্ষণশীলদের হার দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। ইসরায়েলের ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের (আইডিআই) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, হরেডি সম্প্রদায়ের জন্মহার ইসরায়েলের গড় জন্মহারের চেয়ে অনেক বেশি (প্রতি নারীর প্রায় ৬ দশমিক ৪ সন্তান, যেখানে জাতীয় গড় প্রায় ২ দশমিক ৯)। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যে ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৫ শতাংশ হবে এই হরেডি সম্প্রদায়।

গত বছরের শেষের দিকে অতিরক্ষণশীল ইসরায়েলিদের পক্ষ থেকে আয়োজিত বাধ্যতামূলক সামরিক সেবাবিরোধী বিক্ষোভে কয়েক লাখ মানুষ অংশ নিয়েছিল, যা সামাজিক উত্তেজনা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। এই ঘটনা সামরিক সেবা সংস্কার ও ধর্মীয় স্বাধীনতার মধ্যে চলমান সংঘাতের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে।