ইরানের সরকারবিরোধী বৈশ্বিক বিক্ষোভ: পাহলভির আহ্বানে লাখো মানুষ রাজপথে
ইরানের বর্তমান ইসলামি সরকারের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে রাজপথে নেমেছেন লাখো মানুষ। দেশটির সাবেক শাহের নির্বাসিত ছেলে রেজা পাহলভির আহ্বানে শনিবার এই বৈশ্বিক প্রতিবাদ দিবস পালিত হয়। মিউনিখ, লস অ্যাঞ্জেলেস ও টরন্টোসহ বিশ্বের বিভিন্ন বড় শহরে বড় ধরনের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ খবর জানিয়েছে।
মিউনিখে পাহলভির ভাষণ: সরকার উৎখাতের ডাক
শনিবার মিউনিখে প্রায় দুই লাখ পঞ্চাশ হাজার মানুষের এক বিশাল সমাবেশে ভাষণ দেন রেজা পাহলভি। ইরানের বর্তমান ইসলামি সরকারকে উৎখাতের জোরালো ডাক দিয়ে তিনি দেশটিতে বিক্ষোভকারীদের ওপর সরকারি দমন-পীড়নের তীব্র নিন্দা জানান। পাহলভি তার ভাষণে বলেন, ‘দেশের ভেতরে আমার সাহসী ও সংগ্রামী দেশবাসীকে বলতে চাই, আপনারা একা নন। আজ এই সংগ্রামে পুরো বিশ্ব আপনাদের পাশে দাঁড়িয়েছে।’
ইরান সরকারকে ‘দুর্নীতিবাজ, দমনকারী ও শিশু হত্যাকারী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি আরও বলেন, ‘একটি মুক্ত ইরানে আপনারা বিশ্বকে প্রমাণ করে দেবেন আমরা কত মহান জাতি।’ তার এই বক্তব্য সমাবেশে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
টরন্টো ও লস অ্যাঞ্জেলেসে ব্যাপক অংশগ্রহণ
কানাডার টরন্টোতে প্রায় তিন লাখ পঞ্চাশ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। সেখানে অংশ নেওয়া অনেকে জানান, ইরানে থাকা তাদের বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের পক্ষ থেকে আওয়াজ তুলতেই তারা রাজপথে নেমেছেন। এই বিক্ষোভে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থনের একটি শক্তিশালী বার্তা প্রকাশ পায়।
অন্যদিকে, লস অ্যাঞ্জেলেসে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে ভাষণ দেন রেজা পাহলভির মেয়ে নূর পাহলভি। সিবিএস নিউজকে তিনি বলেন, ‘ইরানিরা এই ইসলামি শাসন থেকে নিজেদের মুক্ত করার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।’ এ সময় তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি ইরানের সঙ্গে চলমান পারমাণবিক আলোচনা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘খুনিদের সঙ্গে কোনও আলোচনা হতে পারে না।’
ট্রাম্পের মন্তব্য ও পাহলভির ভূমিকা
শুক্রবার সাংবাদিকদের ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরানের সরকারের পরিবর্তন হবে ‘সবচেয়ে ভালো ঘটনা’। যদিও তার এই মন্তব্য পাহলভির নেতৃত্বের প্রতি কি না, তা স্পষ্ট নয়। গত মাসে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পাহলভি সম্পর্কে ট্রাম্প বলেছিলেন, তাকে ‘খুবই অমায়িক’ মনে হয়। তবে পাহলভি ইরানের ভেতরে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো যথেষ্ট সমর্থন পাবেন কি না, তা নিয়ে ট্রাম্প সংশয় প্রকাশ করেন।
ইরানে বিক্ষোভের পটভূমি ও হতাহতের সংখ্যা
গত ২৮ ডিসেম্বর ইরানে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে প্রথম বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে তা সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয় এবং দেশটির একশতটিরও বেশি শহর ও জনপদে ছড়িয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ নিশ্চিত করেছে যে, এই আন্দোলনে এখন পর্যন্ত একশত পঞ্চাশ শিশুসহ ছয় হাজার আটশত বাহাত্তর জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, ইরানি কর্তৃপক্ষ অন্তত তিন হাজার মানুষের মৃত্যুর কথা স্বীকার করলেও দাবি করেছে যে তাদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যও রয়েছে।
রেজা পাহলভির প্রত্যাবর্তন ও ভবিষ্যৎ ভূমিকা
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের সময় আঠারো বছর বয়সে দেশ ছাড়েন তৎকালীন শাহজাদা রেজা পাহলভি। প্রায় পঞ্চাশ বছর পর তিনি আবারও দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে চাইছেন। ইরানের ভেতর অনেক বিক্ষোভকারীকে তার নাম ধরে স্লোগান দিতেও দেখা গেছে। এই বৈশ্বিক বিক্ষোভ ইরানের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তার প্রভাব ও ভূমিকা নিয়ে নতুন আলোচনার সূত্রপাত করেছে।
