চন্দ্রজয়ী অ্যাপোলো ১১ মিশনে বাজ অলড্রিন কী দেখলেন? জেমিনাই ৭ মিশনে নভোচারী ফ্র্যাঙ্ক বোরম্যান ও জিম লভেল কী দেখলেন? উত্তর: 'ইউএফও'! এই মুহূর্তে ইউএফও নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া সরগরম। কারণ, পেন্টাগন সম্প্রতি 'ইউএফও' নিয়ে 'একগাদা' ফাইল উন্মুক্ত করে দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আহ্বানে সাড়া দিয়ে গত ৯ মে নতুন এই ফাইলগুলো উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।
ইউএফও নাকি ইউএপি?
প্রথমেই জেনে নেওয়া যাক, 'ইউএফও' শব্দটি আনুষ্ঠানিকভাবে সাধারণত ব্যবহার করা হয় না, বলা হয় 'ইউএপি'। ইউএফও মানে 'আনআইডেন্টিফায়েড ফ্লাইং অবজেক্টস'; বাংলায় যার অর্থ 'শনাক্ত করা যায় না, এমন উড়ন্ত বস্তু'। তবে বাংলায় বহুল ব্যবহৃত শব্দ 'উড়ন্ত চাকতি', কারণ বেশির ভাগ বর্ণনায় চাকতি আকৃতির উড়ন্ত বস্তু দেখার কথা শোনা যায়। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে 'চাকতি' দেখার বর্ণনা খুব বেশি নেই; বরং উদ্ভট বিভিন্ন জিনিস দেখার কথা জানা যায়। যেমন বাজ অলড্রিন একধরনের 'অদ্ভুত আলো' দেখেছেন বলে জানিয়েছেন। ফলে 'উড়ন্ত চাকতি' না বলে এ ধরনের অদ্ভুত সব ঘটনাকে এখন বলা হচ্ছে 'আনআইডেন্টিফায়েড অ্যানোমোলাস ফেনোমেনা' বা 'অব্যাখ্যাত ঘটনা'।
ট্রাম্পের আহ্বান ও পেন্টাগনের ফাইল
যুক্তরাষ্ট্রের মানুষদের ইউএফও নিয়ে অনেক আগ্রহ। দ্য সানডে গার্ডিয়ানের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ৬৫ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করেন এলিয়েন বা বহির্জাগতিক প্রাণের অস্তিত্ব আছে। অনেকে তো মনে করেন পৃথিবীতে সত্যিই এলিয়েন এসেছে! সব মিলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর ট্রুথ সোশ্যাল-এ ফেব্রুয়ারি মাসে এক পোস্টে বলেছিলেন, 'মানুষের এত আগ্রহ দেখে আমি যুদ্ধসচিব এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও এজেন্সিকে নির্দেশ দিচ্ছি, আনআইডেন্টিফায়েড এরিয়াল ফেনোমেনা এবং আনআইডেন্টিফায়েড ফ্লাইং অবজেক্টস সংশ্লিষ্ট নথিপত্রগুলো উন্মুক্ত করে দাও।' ফলে পেন্টাগন ১৬০০টি ফাইল উন্মুক্ত করে দিয়েছে। সরকার বলছে, 'স্বচ্ছতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।' কিন্তু অনেকেই তা মনে করেন না। পেন্টাগনের 'অল-ডোমেইন অ্যানোমালি রেজোল্যুশন অফিস'-এর প্রাক্তন পরিচালক শন কার্কপ্যাট্রিক সায়েন্টিফিক আমেরিকানকে জানিয়েছেন, 'এই ফাইলগুলো রহস্য কমানোর বদলে জল্পনা-কল্পনা আরও বাড়িয়ে দেবে।' তাঁর মতে, 'এই ফাইলগুলোতে অবাক হওয়ার মতো কিছু নেই। কোনো সঠিক বিশ্লেষণ বা প্রেক্ষাপট ছাড়া এগুলো কেবল ষড়যন্ত্রতত্ত্ব আর অপবিজ্ঞানকেই উসকে দেবে, বিশেষ করে রাজনৈতিক মহলে।'
নভোচারীদের দেখা অদ্ভুত ঘটনা
ফাইলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো জেমিনাই ৭ মিশনের নভোচারী ফ্র্যাঙ্ক বোরম্যান ও জিম লভেল 'বগি' দেখার কথা জানান। 'বগি' একটি সামরিক পরিভাষা, যা দিয়ে শনাক্ত করা যায়নি এমন যেকোনো বস্তুকেই বোঝানো হয়। নাসা পরে জানিয়েছিল, এটি জমে যাওয়া জ্বালানির কণা বা এরকম কিছু হতে পারে। অ্যাপোলো ১১ মিশনে বাজ অলড্রিন 'কী যেন' দেখেছেন, যা ফ্ল্যাশিং লাইটের মতো ছিল। অন্য নভোচারী ও গবেষকদের ধারণা, এগুলো রকেটের অবশিষ্টাংশ। অ্যাপোলো ১২ মিশনের নভোচারী অ্যালান বিন ও পিট কনরাড 'জ্বলজ্বলে কণা' দেখার দাবি করেন। অ্যাপোলো ১৭ মিশনেও একই ধরনের ঘটনা দেখা যায়। বিজ্ঞানীরা এগুলোর কিছুকে বরফের আলো প্রতিফলন বলে ব্যাখ্যা করলেও অনেক ঘটনার ব্যাখ্যা এখনও অজানা।
বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা
প্রদীপ দেবের 'ইউএফও এবং পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম' লেখায় বলা হয়েছে, মানুষ মহাকাশে বিভিন্ন স্যাটেলাইট পাঠানো শুরু করেছে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি। গত ৬০ বছরে সৌরজগতের সব কটি গ্রহ-উপগ্রহের প্রায় সব জায়গা জরিপ করা হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত কোথাও ভিনগ্রহের প্রাণীর সন্ধান পাওয়া যায়নি। পৃথিবী থেকে সর্বোচ্চ গতিতে পাঠানো স্যাটেলাইট পার্কার সোলার প্রোব ঘণ্টায় প্রায় সাত লাখ কিলোমিটার বেগে ছুটছে, যা সূর্যের কাছে পৌঁছাতে ছয় বছরের বেশি সময় নিয়েছে। সেখানে কথিত ইউএফও আলোর চেয়ে দ্রুতগতিতে আসছে এবং চলে যাচ্ছে, যা পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মে অবিশ্বাস্য।
উপসংহার
বিজ্ঞানীরা এ পর্যন্ত ইউএফও নিয়ে এমন কোনো ঘটনা পাননি যা নতুন কিছুর ইঙ্গিত দেয়। তবে অনেক ঘটনা এখনো শতভাগ নিশ্চিতভাবে ব্যাখ্যা করা যায়নি তথ্যের অভাবে। সেই ঘটনাগুলোকেই বলা হয় ইউএপি। অর্থাৎ ঘটনাগুলো রহস্যময় নয়, বরং ব্যাখ্যার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য নেই। 'ইউএপি' বা 'ইউএফও' শব্দগুলো বহির্জাগতিক প্রাণের চিত্র তুলে ধরে, কিন্তু তার সঙ্গে এসব ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই। সচেতন পাঠকের প্রতি অনুরোধ, শুধু শিরোনাম নয়, ভেতরের সংবাদও পড়ুন। রাত-দুপুরে অযথা এলিয়েনের কথা ভেবে 'হাই-প্রেশার' ও 'হাই-টেনশন'-এ ভোগা কোনো কাজের কথা না।



