এল সালভাদরে মারা সালভাৎরুচা গ্যাংয়ের ৪৯০ সদস্যের বিচার শুরু, ২৯ হাজার হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ
এল সালভাদরে এমএস-১৩ গ্যাংয়ের ৪৯০ সদস্যের বিচার শুরু

এল সালভাদরে কুখ্যাত এমএস-১৩ গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক বিচার কার্যক্রম শুরু

মধ্য আমেরিকার ছোট্ট দেশ এল সালভাদর বর্তমানে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে উঠে এসেছে একটি কুখ্যাত হত্যাকাণ্ডের বিচার কার্যক্রম নিয়ে। দেশটির মানচিত্র চেনেন না এমন অনেকেই হয়তো দ্বিধায় পড়ে যাবেন, কিন্তু অপরাধের ইতিহাসে এই দেশটির নাম এখন স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ। মারা সালভাৎরুচা নামে পরিচিত, যাকে সংক্ষেপে এমএস-১৩ গ্যাং বলা হয়, সেই অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে বড় আকারের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

৪৯০ সদস্যের বিরুদ্ধে ২৯ হাজার হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ

এল সালভাদরের আদালতে সোমবার থেকে শুরু হওয়া শুনানিতে এমএস-১৩ গ্যাংয়ের ৪৯০ নেতা ও কর্মীর বিচার কার্যক্রম চলছে। অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই সন্দেহভাজন সদস্যদের বিরুদ্ধে মোট ৪৭ হাজার বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, এই অভিযোগগুলোর মধ্যে ২৯ হাজার মানুষের হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

আদালতের ভাষ্যমতে, এই শুনানিতে অংশ নিচ্ছেন এমএস-১৩ অপরাধ চক্রের জাতীয় নেতৃত্ব, স্থানীয় পর্যায়ের নেতা এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে থাকা সমন্বয়কারীরা। তাদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে আটক অবস্থায় রয়েছেন, আর এখন বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রেসিডেন্ট বুকেলের যুদ্ধ ঘোষণা ও জরুরি অবস্থা

২০২২ সালের মার্চ মাসে এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলে অপরাধী চক্রগুলোর বিরুদ্ধে ব্যাপক দমন অভিযান শুরু করেন। সে সময় দেশটির প্রায় ৮০ শতাংশ ভূখণ্ডই বিভিন্ন অপরাধী চক্রের দখলে ছিল বলে জানা যায়। বিশেষ করে ২০০২ সালের মার্চ মাসে এক সাপ্তাহিক ছুটিতে ৮৭ জনের হত্যাকাণ্ডের মতো ভয়াবহ ঘটনা ঘটে, যা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যায়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রেসিডেন্ট বুকেলে তখন অপরাধী চক্রগুলোর বিরুদ্ধে স্পষ্টভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করেন এবং দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন। এই বিশেষ আইনের আওতায় এমএস-১৩ গ্যাংয়ের ৯১ হাজারেরও বেশি সন্দেহভাজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়, যদিও পরবর্তীতে তাদের মধ্যে অনেকেই নির্দোষ প্রমাণিত হন।

বিদ্রোহ ও বিকল্প রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের অভিযোগ

অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, এমএস-১৩ গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে মূলত বিদ্রোহে জড়ানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। কৌসুলিরা দাবি করেছেন যে এই অপরাধী চক্র একটি বিকল্প রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল, যা রাষ্ট্রদ্রোহের সমতুল্য। তাদের ভাষায়, আমরা তাদের বিচার করবো এবং তাদের যা প্রাপ্য, তা কড়ায় গণ্ডায় মিটিয়ে দেওয়া হবে

এল সালভাদর কর্তৃপক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, এই অপরাধ চক্রের সদস্যরা শুধু হত্যাকাণ্ডেই নয়, বরং নানাবিধ অপরাধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল। তাদের কার্যক্রমের সময়সীমা ২০১২ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত বলে দাবি করা হয়েছে।

বিচার প্রক্রিয়া ও মানবাধিকার সংস্থার উদ্বেগ

বর্তমানে চলমান এই গণশুনানিতে একটি অনন্য পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। কারাগারে আটক কয়েদীরা ভিডিও লিংকের মাধ্যমে জেরা ও শুনানিতে অংশ নিচ্ছেন। তবে বিচারকদের নাম প্রকাশ না করায় মানবাধিকার সংস্থাগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের আশঙ্কা, অপরাধের গুরুত্ব ও প্রমাণ যথাযথভাবে বিবেচনা না করে চক্রের সদস্যদের গণহারে দণ্ড দেওয়া হতে পারে।

এল সালভাদরের এই অভিযানের ফলে দেশটিতে অপরাধের হার উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এক সময় লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বিপজ্জনক দেশ হিসেবে বিবেচিত এল সালভাদর এখন ওই অঞ্চলের নিরাপদতম দেশগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। এই সাফল্যের কারণে প্রেসিডেন্ট বুকেলে দেশবাসীর মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছেন।

আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা

সমগ্র মধ্য আমেরিকাজুড়ে মাদক পাচার, চাঁদাবাজি এবং সহিংস অপরাধে জড়িয়ে আছে এমএস-১৩ এবং তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী বারিও ১৮ নামের অপরাধী চক্র। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন এই দুই সংগঠনসহ আরও কয়েকটি অপরাধী চক্রকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট বুকেলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত, যা এই অপরাধ দমনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি দিক নির্দেশ করে।

এল সালভাদরের এই বিচার কার্যক্রম শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং এটি মধ্য আমেরিকা অঞ্চলের অপরাধ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে অপরাধী চক্রগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে এই বিচার প্রক্রিয়া একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ স্থাপন করতে পারে।