লক্ষ্মীপুরের রামগতি ও কমলনগর উপজেলার দূর্গম চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় ঈদকে ঘিরে কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। দুই উপজেলার অন্তত চার শতাধিক স্পটে সক্রিয় রয়েছে কিশোর গ্যাংয়ের অন্তত ১০ হাজারেরও বেশি সদস্য। পাড়া-মহল্লায় প্রকাশ্যে দেশীয় অস্ত্র হাতে এদের মহড়া, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, হামলা, মারধর, চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির মতো ঘটনায় সাধারণ মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। নিজ এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতে এক গ্রুপ অন্য গ্রুপের সঙ্গে ভয়ঙ্কর সংঘাতে লিপ্ত হচ্ছে। কিশোর অপরাধীদের এই বেপরোয়া কর্মকাণ্ড ঠেকাতে রীতিমতো নাজেহাল হয়ে পড়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
মেঘনা নদী ও চরাঞ্চলে অপরাধের আখড়া
মেঘনা নদী ও চরাঞ্চল বেষ্টিত এই দুই উপজেলায় ছিনতাই, চুরিসহ পাড়া-মহল্লায় যেকোনো অপরাধ ঘটলেই সবার আগে আসছে কিশোর গ্যাংয়ের নাম। যাদের এখন পড়ার টেবিলে থাকার কথা, তারা দামী মোবাইল হাতে নিয়ে জড়িয়ে পড়ছে ভয়ঙ্কর সব অপরাধে।
স্থানীয়দের অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, হাটবাজার, স্কুল-কলেজের আশপাশ, নদীর তীরবর্তী এলাকা, রাস্তার মোড় ও পাড়া-মহল্লায় সন্ধ্যার পর থেকেই গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডায় মেতে ওঠে এরা। মারামারি, ছিনতাই, মাদক সেবন, ইভটিজিং ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন গ্রুপ সৃষ্টি হচ্ছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ও স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীর আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এসব গ্রুপের সদস্যরা দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
সক্রিয় স্পটগুলোর তালিকা
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রামগতির আলেকজান্ডার বটতলা, আসলপাড়া, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনের বেঁড়ীবাধ, আশ্রম বাজার, জমিদারহাটের দক্ষিণ-উত্তর মাথা, কেরামতিয়া, হারুন বাজার, গান্দাটোলা, সুফিরহাট, রামদয়াল, স্টিল ব্রিজ, আদর্শগ্রাম, সৈয়দ মৌলভীরহাট, চৌধুরী বাজার, বিবিরহাটের চারপাশ, রামগতি বাজার মাছঘাট ও মীর রোড, আহমদিয়া কলেজের সামনে, বড়খেরী, চরগাজী, চররমিজ, চরপোড়াগাছা, চরআলগী ও চরবাদাম ইউনিয়ন এবং কমলনগরের করইতলা বাজার, আনন্দ বাজার, করুনানগর, চরকাদিরা ইউনিয়নের ফজুমিয়ারহাট পুর্ব বাজার ও ভুলুয়া ব্রীজ, সাবেক চেয়ারম্যান হোসেন হাওলাদারের পুরান বাড়ির দরজার দোকান, চরঠিকা আশ্রয়ণ প্রকল্প, চরবসু বাজার, রববাজার, তোরাবগঞ্জ, ইসলামগঞ্জ, রহিমগঞ্জ, হাজী ফাজিল মিয়ার হাট, হাজিরহাট ইউনিয়নের সাতদরুন, মিয়াপাড়া, লক্ষ্মীপুর-রামগতি আঞ্চলিক সড়কের বিভিন্ন হাটবাজার, চরকালকিনি, চরমার্টিন, চরলরেন্স, চরফলকন, পাটারিরহাট ও সাহেবেরহাট ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা প্রকাশ্যে আড্ডা ও অপরাধের রাজত্ব গড়ে তুলেছে।
সাম্প্রতিক ঘটনা
গত ২৩ মার্চ কমলনগরের চরলরেন্স ইউনিয়নের চুঙ্গারগোড়া এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় তিনজন আহত হন, যা নিয়ে থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়। অতিসম্প্রতি একইভাবে করইতলা বাজারে দুই গ্রুপের মধ্যে কয়েক দফা মারামারি ও মহড়ার ঘটনায় মামলা হয়। গত ১০ এপ্রিল রামগতি উপজেলার চররমিজ ইউনিয়নের চরআফজল গ্রামে চাঁদা না পেয়ে মো. ছিদ্দিক নামের এক দিনমজুরকে পিটিয়ে আহত করে কিশোর অপরাধীরা। ২৬ এপ্রিল বড়খেরী ইউনিয়নের রঘুনাথপুর পল্লী মঙ্গল উচ্চ বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীর ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে অগ্নিসংযোগ ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। সর্বশেষ গত ১৯ মে আলেকজান্ডার বাজারে দুই গ্রুপের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়, যার জেরে আতঙ্কে ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ করতে বাধ্য হন।
অভিভাবকদের উদ্বেগ
স্থানীয় অভিভাবকরা জানান, মোবাইলে জুয়ায় আসক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, মাদক এবং বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে এই কিশোররা সংঘবদ্ধ হচ্ছে। অল্প বয়সেই তারা অবলীলায় মারাত্মক অপরাধে জড়াচ্ছে, যার ফলে সন্ধ্যার পর সাধারণ মানুষ চরম আতঙ্ক নিয়ে চলাচল করছেন।
ভুক্তভোগী নুরুল ইসলাম জানান, বর্তমানে এ অঞ্চলের প্রধান সমস্যা কিশোর গ্যাং। এরা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে স্কুলগামী ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করছে এবং চুরি-ডাকাতি বাড়াচ্ছে। স্কুল শিক্ষক জহির উদ্দিন শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এদের এখনই কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে যেকোনো সময় বড় ধরনের খুনাখুনির ঘটনা ঘটতে পারে।
পুলিশের বক্তব্য
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন স্থানে কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চললেও রামগতি ও কমলনগরে তেমন কোনো তৎপরতা নেই। পুলিশ প্রশাসনের নীরবতা ও পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণেই এরা দিন দিন আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে কমলনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফরিদুল আলমের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, সামাজিক শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং যে কোনো ধরনের অপরাধ প্রবণতা প্রতিরোধ করতে সার্বক্ষণিকভাবে পুলিশি তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে কিশোরগ্যাং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।
রামগতি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লিটন দেওয়ান জানান, রামগতিতে কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়ে কোনো আপস নেই। এ পর্যন্ত যে কয়টি অভিযোগ পাওয়া গেছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে পুলিশ সার্বক্ষণিক সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।



