মাদকের টাকার জন্য মায়ের মাথা ফাটানো, মায়ের পেটে ছুরি চালানো, স্বামীর নির্যাতনে স্ত্রীর আত্মহত্যা—এসব ঘটনা ঘটেছে রাজশাহী ও নাটোরে। মাদকাসক্তির কারণে পরিবারে নেমে এসেছে অন্ধকার। ক্ষমতাসীন দলের 'জিরো টলারেন্স' স্লোগান পুরোনো হলেও বাস্তবে মাদকের দৌরাত্ম্য থামছে না।
এক. ফেনসিডিল ব্যবসার জন্য স্ত্রী নির্যাতন
ফেনসিডিল ব্যবসার জন্য বাবার বাড়ি থেকে এক লাখ টাকা আনতে হাসিনা খাতুনের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছিলেন তাঁর স্বামী মো. রাতুল। অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে গত ৫ মে হাসিনা কীটনাশক পান করেন। হাসপাতালে নেওয়ার পর স্ত্রীর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে রাতুল স্ত্রীর গা থেকে সব গয়না খুলে নিয়ে পালিয়ে যান। হাসিনার লাশ পড়ে ছিল রাজশাহী মেডিকেল কলেজের হিমঘরে। রাতুলের বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার রাজাবাড়ি মোল্লাপাড়া গ্রামে। প্রায় ৭ মাস আগে রাতুলের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। হাসিনা (২১) দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।
দুই. মায়ের মাথা ফাটাল মাদকাসক্ত ছেলে
মাদক সেবনের জন্য প্রতিদিন মায়ের কাছে টাকা চান সুজন আলী (২৮)। না দিতে পারলে মাকে মারেন, বাড়িতে ভাঙচুর করেন। অতিষ্ঠ হয়ে মা শরীফা বেগম গিয়েছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে। তিনি পাঠিয়েছিলেন থানায়। কিন্তু পুলিশ ছেলেকে ধরতে পারেনি। তখন ছেলে বাঁধা গরু ছাড়া পাওয়ার মতো আচরণ শুরু করেন। ইট ছুড়ে মায়ের মাথা ফাটিয়ে দেন। একই অবস্থা করেন বড় বোন ডালিয়ার (৩৫)। গত ৩১ জানুয়ারি দুপুরে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার শিয়ালা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। মা ও মেয়ে গোদাগাড়ী উপজেলা (প্রেমতলী) স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন। হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, মা শরীফার মাথা দিয়ে রক্ত ঝরছে। তিনি জরুরি বিভাগের বেডে শুয়ে কেঁদেই যাচ্ছেন। তাঁর মাথার নিচে একটি ওড়না, সেটি রক্তে ভেসে গেছে। পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন মেয়ে ডালিয়া। তাঁর মাথাও ফেটেছে ইটের আঘাতে। তিনি তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
ডালিয়া বলেন, 'আমার দুই ভাই। এর মধ্যে বড় ভাই সুজন মাদকাসক্ত। হেরোইন, গাঁজা, ইয়াবা—সব খান। মাদকের টাকার জন্য রোজ বাড়িতে ঝামেলা করেন। এ জন্য সন্তান রেখেই তাঁর স্ত্রী চলে গেছেন। সুজন কোনো কাজ করেন না। বৃদ্ধ মা ছোট ছেলে রুবেলের সংসারে খান। তাঁর কাছেই টাকার জন্য প্রতিদিন চাপ দেন সুজন। আমি অন্তঃসত্ত্বা। কবে জানি আমাদের মেরেই ফেলবে।' এ কথা বলেই হু হু করে কান্নায় ভেঙে পড়েন ডালিয়া।
তিন. মায়ের পেটে ছুরি চালাল ছেলে
সাজেদা বেগমের বয়স প্রায় ৫৫। তাঁর স্বামী আবদুল মতিন আরেকটি বিয়ে করে অন্যত্র থাকেন। ছেলে রাজন (২২) স্ত্রীকে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে থাকেন। রাজন মাঝেমধ্যেই তাঁর মায়ের কাছে এসে মাদক সেবনের জন্য জোর করে টাকা নিয়ে যান। ৩ মে বিকেলে তিনি তাঁর মায়ের কাছে এসে ৫০০ টাকা দাবি করেন। মা টাকা দিতে পারেননি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে রাজন পকেট থেকে ছুরি বের করে তাঁর মায়ের পেটে উপর্যুপরি আঘাত করেন। এতে মায়ের নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে যায়। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরের দিন এই মায়ের মৃত্যু হয়। ঘটনা নাটোরের বড়াইগ্রামের। শ্বশুরবাড়ি থেকে ছেলেকে আটক করেছে পুলিশ।
চার. মাদক সিন্ডিকেটের এলাকা নিয়ে বিতর্ক
তানোর থানার ওপেন হাউস ডে অনুষ্ঠান ছিল ৭ মে। তানোর পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি শমশের আলী তাঁর বক্তব্যে বলেন, 'তানোর পৌর সদরের চিহ্নিত মাদক সিন্ডিকেট এলাকা হিসেবে পরিচিত ঠাকুরপুকুরে বর্তমানে আর মাদক ব্যবসা হয় না।' সঙ্গে সঙ্গে অনুষ্ঠানে উপস্থিত লোকজন সমস্বরে 'হয় হয় হয়', 'হয় হয় হয়' বলে তাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন। এ অবস্থায় অনুষ্ঠানে হাসির রোল পড়ে যায়। এ অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন রাজশাহীর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাঈমুল হাছান। সভাপতিত্ব করছিলেন তানোর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম মাসুদ পারভেজ। বিশেষ অতিথি ছিলেন গোদাগাড়ী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মীর্জা আবদুস সালাম। বিএনপি-জামায়াতের নেতা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
ওসি এস এম মাসুদ পারভেজের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'যাঁরা বক্তব্য দিয়েছেন বা প্রতিবাদ করেছেন, তাঁরাই এটা বলতে পারবেন। আমরা সরকারের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঠাকুরপুকুরে মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রেখেছি। মাদকের ব্যাপারে আমাদের জিরো টলারেন্স।'



