রাশিয়ার গোপন ঘাঁটি নির্মাণের অভিযোগ: ইউরোপজুড়ে সংবেদনশীল স্থাপনার কাছে সম্পত্তি কেনা
রাশিয়ার গোপন ঘাঁটি নির্মাণের অভিযোগ ইউরোপে

রাশিয়ার গোপন ঘাঁটি নির্মাণের অভিযোগ: ইউরোপজুড়ে সংবেদনশীল স্থাপনার কাছে সম্পত্তি কেনা

পশ্চিম ইউরোপজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনার কাছাকাছি জমি ও ভবন কিনে সেগুলোকে সম্ভাব্য গোপন ঘাঁটিতে রূপান্তরের অভিযোগ উঠেছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে। ইউরোপীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, এসব সম্পত্তি ভবিষ্যৎ সংকটে সমন্বিত নাশকতা, ড্রোন হামলা বা নজরদারি অভিযানের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা থাকতে পারে।

দুর্বল আইনি কাঠামোর সুযোগ নিচ্ছে রাশিয়া

তিনটি ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থার বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তারা ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফ-কে জানান, দুর্বল আইনি কাঠামোর সুযোগ নিয়ে রাশিয়ার গোপন ইউনিটগুলো অন্তত এক ডজন ইউরোপীয় দেশে সংবেদনশীল এলাকায় সম্পত্তি কিনেছে। গ্রীষ্মকালীন বাড়ি, ছুটির কেবিন, গুদামঘর, পরিত্যক্ত স্কুল, শহুরে অ্যাপার্টমেন্ট—এমনকি পুরো দ্বীপও এই তালিকায় রয়েছে। কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, কিছু স্থানে ইতিমধ্যেই বিস্ফোরক, ড্রোন ও অন্যান্য সরঞ্জাম মজুত থাকতে পারে, যা সংকটমুহূর্তে সক্রিয় করা সম্ভব।

ইউক্রেন যুদ্ধের পর নাশকতার আশঙ্কা বৃদ্ধি

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর থেকে ইউরোপে রাশিয়া-সংশ্লিষ্ট নাশকতার অভিযোগ বেড়েছে। লন্ডন ও ওয়ারশতে অগ্নিসংযোগ, পার্সেল বোমা ও ট্রেন লাইনচ্যুত করার চেষ্টার মতো ঘটনা ঘটেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, বড় অভিযানের আগে এগুলো ‘পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ’ হতে পারে। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, সরাসরি সামরিক হামলার বদলে মস্কো তথাকথিত ‘গ্রে জোন’ কৌশলে ন্যাটোর সংকল্প যাচাই করতে পারে। এতে পরিবহন, জ্বালানি ও যোগাযোগ অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে, অথচ হামলার দায় অস্বীকার করে কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি করা সম্ভব।

ব্রিটেনকে উচ্চ ঝুঁকিতে দেখছেন বিশ্লেষকরা

যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা এমসিক্সটিন-এর নতুন প্রধান ব্লেইজ মেট্রেউইলি সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, দেশটি এখন ‘শান্তি ও যুদ্ধের মাঝামাঝি এক বাস্তবতায়’ কাজ করছে। তাঁর ভাষায়, রাশিয়া যুদ্ধের সীমার ঠিক নিচে থেকে কৌশল প্রয়োগ করছে। লন্ডনের ভক্সহলে এমআই৬ সদর দপ্তর ও নাইন এলমসে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের কাছাকাছি সন্দেহজনক সম্পত্তি কেনাবেচা তদন্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি পশ্চিম স্কটল্যান্ডের ফাসলেনে ট্রাইডেন্ট সাবমেরিন ঘাঁটি এবং শেটল্যান্ডে সমুদ্রতলের কেবল অবতরণস্থলের আশপাশেও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

ফিনল্যান্ডে ‘সামরিক দ্বীপ’ কেলেঙ্কারি

ফিনল্যান্ডে রুশ-সংশ্লিষ্ট কোম্পানি অ্যায়ারস্টোন হেলমি আর্কিপেলাগো সাগর এলাকায় ১৭টি সম্পত্তি কিনেছিল, যার মধ্যে সাক্কিলুওতো দ্বীপ বিশেষভাবে আলোচিত হয়। ২০১৮ সালে পুলিশ অভিযানে সেখানে হেলিপ্যাড, জেটি, নজরদারি ক্যামেরা ও উন্নত যোগাযোগ সরঞ্জাম পাওয়া যায়। ঘটনার পর ফিনল্যান্ড রুশ ও বেলারুশ নাগরিকদের সম্পত্তি ক্রয়ে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে। বাল্টিক দেশগুলোও একই পথ অনুসরণ করেছে।

নর্ডিক ও ইউরোপজুড়ে বাড়ছে উদ্বেগ

নরওয়ে, সুইডেন ও বাল্টিক অঞ্চলে সামরিক ঘাঁটি ও রাডার স্থাপনার কাছে রুশ-সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি কেনা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সুইডেনের ভেস্টেরোসে একটি রুশ অর্থোডক্স গির্জা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরের কাছে নির্মাণ করা হয়েছে, যা পরে গোয়েন্দা নজরদারির আওতায় আসে। সুইজারল্যান্ডেও সংবেদনশীল স্থাপনার কাছাকাছি রুশ সম্পত্তি কেনার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে জেনেভার নিকটে অবস্থিত লার্জ হাডরোন কোলিডার এলাকার আশপাশে।

চীনের ‘দীর্ঘমেয়াদি’ নজরদারি কৌশল

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, চীনও সীমিত পরিসরে অনুরূপ কৌশল অনুসরণ করছে। তাদের লক্ষ্য তাৎক্ষণিক নাশকতার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি—বিশেষ করে ফাইবার-অপটিক রুট, ডেটা সেন্টার ও যোগাযোগ অবকাঠামোর কাছে অবস্থান নেওয়া।

ইউরোপজুড়ে আইনগত দুর্বলতা

রুশ নাগরিকদের কাছে সম্পত্তি বিক্রি নিষিদ্ধ করার ইউরোপীয় ইউনিয়নব্যাপী প্রস্তাব গত বছর গৃহীত হয়নি। কিছু দেশ অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কায় আপত্তি তোলে। ফলে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন আইন কার্যকর থাকায় সমন্বিত প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি। এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, ‘যত দিন পাল্টা গোয়েন্দা তৎপরতা শুধু জাতীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে, তত দিন ইউরোপজুড়ে বিস্তৃত এই হুমকি মোকাবিলা করা কঠিন হবে।’ সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ