মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি থমকে: দুদকের মামলা ও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব
মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি থমকে: দুদকের মামলা

মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি থমকে: দুদকের মামলা ও আন্তর্জাতিক প্রভাব

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের জন্য বড় শ্রমবাজার মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানি এখন শঙ্কার মধ্যে পড়েছে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে স্থিতিশীল দেশ মালয়েশিয়া একটি বড় বিকল্প বাজার হতে পারত। কিন্তু দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) শতাধিক মামলার কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ বাজারটিতে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি সম্পূর্ণ থমকে আছে। সম্প্রতি মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ায় অনুষ্ঠিত শ্রমবাজার খোলার বিষয়ে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই চলমান মামলাগুলো নিয়ে উভয় পক্ষ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

মামলার পটভূমি ও বৈঠকের আলোচনা

সূত্র থেকে জানা গেছে, মালয়েশিয়া পক্ষ তাদের আন্তর্জাতিক সুনামকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এমন যে কোনো ভিত্তিহীন বা বিদ্বেষপূর্ণ কর্মকাণ্ড বন্ধের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ পক্ষ আইনের শাসন, যথাযথ প্রক্রিয়া, জবাবদিহিতা এবং সময়োপযোগী বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বৈঠকে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোকে কেন্দ্র করে চলমান মামলা ও তদন্ত নিষ্পত্তির শর্তে শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, নানা অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ৩১ মে থেকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। এই বন্ধের আগে ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে মোট ৩ লাখ ৫১ হাজার ৬৮৩ জন শ্রমিক মালয়েশিয়ায় গিয়েছিলেন। বাংলাদেশি শ্রমিকরা সাধারণত সেখানে নির্মাণ, বনায়ন এবং ম্যানুফাকচারিং খাতে কাজ করে থাকেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মামলার বিস্তারিত ও তদন্ত প্রক্রিয়া

জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পরপরই একটি ওভারসিজের মালিক ব্যবসায়ী আলতাফ খান মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে পল্টন থানায় মানব পাচার ও চাঁদাবাজির একটি মামলা দায়ের করেন। অভিযোগ রয়েছে, সে সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বেশ কয়েকজনকে দিয়ে তৎকালীন ওসির ওপর চাপ তৈরি করে মামলাটি গ্রহণে বাধ্য করা হয়।

এরপর মামলাটির তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য আদালত থেকে সিআইডিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সিআইডি তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করে যে, মামলা তদন্তে চূড়ান্তভাবে প্রতীয়মান হয় যে, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২ অনুযায়ী দায়ের করা অভিযোগগুলো মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় তাদের মামলার দায় থেকে অব্যাহতি প্রদানের আবেদন করা হলো।

একই সঙ্গে, মিথ্যা মামলা দায়ের করায় বাদীর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ২১১ ধারায় এবং মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২-এর ১৫ ধারার বিধান অনুযায়ী প্রসিকিউশন দাখিলের প্রস্তাব করা হয় সিআইডির প্রতিবেদনে। এরপর বাদী আলতাফ হোসেন আদালতে নারাজি প্রতিবেদন দিলে মামলাটি পুনরায় তদন্ত করার জন্য ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি) দায়িত্ব দেওয়া হয়। বর্তমানে মামলাটি ডিবিতে তদন্তাধীন রয়েছে।

দুদকের ভূমিকা ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

এর মধ্যেই একই ধরনের অভিযোগে দুদক মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে মামলা করে। সে সময় মালয়েশিয়ার দুর্নীতি দমন কমিশন অনুসন্ধান করে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে মানব পাচার ও অর্থ পাচার হয়নি মর্মে প্রতিবেদনও দেয়।

এদিকে, গত বছরের এপ্রিল মাসে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে দেওয়া এক চিঠিতে মামলাগুলো অসত্য উল্লেখ করে দুই দেশের স্বার্থে মামলাগুলো প্রত্যাহারের অনুরোধ জানায়। এরপর বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে একই মাসের শেষ সপ্তাহে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সেক্রেটারি জেনারেলের কাছে সত্যতা না পাওয়ায় এসব মামলা প্রত্যাহার করা হবে জানিয়ে ফের কর্মী পাঠানো শুরু করার অনুরোধ করা হয়।

তবে সে সময় দুদক মামলা প্রত্যাহারের পরিবর্তে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আপত্তি সত্ত্বেও ধারাবাহিকভাবে মামলা দিতেই থাকে। তবে অচলাবস্থা কাটিয়ে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার লক্ষ্যে সম্প্রতি দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের একটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও সমাধানের পথ

ঐ বৈঠক শেষে ঘোষণাপত্রে সাতটি বিষয় উল্লেখ করে মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে সব সোর্স কান্ট্রির জন্য প্রযোজ্য একটি ডিজিটাল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা চালুর কথা জানানো হয়। এই ব্যবস্থার লক্ষ্য অভিবাসন খরচ কমানো এবং নিয়োগকর্তারাই যাতে নিয়োগের সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন, তা নিশ্চিত করা।

মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ায় অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে শ্রমবাজার খোলার প্রশ্নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল চলমান মামলাগুলোর নিষ্পত্তি। বৈঠকের যৌথ ঘোষণাপত্রে মালয়েশিয়া পক্ষ তাদের আন্তর্জাতিক সুনাম নষ্ট করতে পারে এমন যে কোনো ভিত্তিহীন বা বিদ্বেষপূর্ণ কর্মকাণ্ড বন্ধের ওপর জোর দিয়েছে। মূলত এসব মামলার কারণেই শ্রমবাজার খোলার বিষয়টি থমকে আছে।

বৈঠকে উভয়পক্ষ মালয়েশিয়ার খাতভিত্তিক চাহিদার ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার খোলার প্রক্রিয়া দ্রুত বাস্তবায়নের বিষয়ে সম্মত হয়েছে। এই সম্মতি সত্ত্বেও মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত শ্রমবাজার খোলার প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না।