যুক্তরাজ্যের অভিবাসন ব্যবস্থায় আসছে গত পাঁচ দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন
ব্রিটিশ সরকার দেশটির অভিবাসন ব্যবস্থায় গত ৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও যুগান্তকারী পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। নতুন প্রস্তাবিত 'আর্নড সেটলমেন্ট' মডেলের আওতায় যুক্তরাজ্যে স্থায়ী বসবাসের আবেদনের (আইএলআর) সময়সীমা বর্তমানের ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করা হচ্ছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাস থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই কঠোর নিয়ম নিয়ে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত হাজার হাজার প্রবাসী বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের অভিবাসীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থায়ী নাগরিকত্ব এখন 'উপার্জনের' বিষয়
স্বরাষ্ট্র দফতরের ২০২৫ সালের মে মাসে প্রকাশিত 'ইমিগ্রেশন হোয়াইট পেপার' অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে স্থায়ী নাগরিকত্ব এখন আর কোনও 'স্বয়ংক্রিয় অধিকার' হিসেবে বিবেচিত হবে না। বরং এটি যোগ্যতা ও অবদানের ভিত্তিতে 'উপার্জন' করে নিতে হবে। নতুন নিয়মে ইংরেজি ভাষার দক্ষতার মান আগের 'বি-১' স্তর থেকে বাড়িয়ে 'বি-২' স্তরে উন্নীত করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিশেষ কিছু শর্ত পূরণকারী উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের জন্য দ্রুততম পথ খোলা থাকবে। যারা বছরে ১ লাখ ২৫ হাজার পাউন্ডের বেশি আয় করবেন, তারা মাত্র ৩ বছরের মধ্যে আইএলআর পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। তবে সাধারণ দক্ষ কর্মীদের জন্য এই প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হবে। তাদের ১০ বছর এবং কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে ১৫ বছর পর্যন্ত দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকতে হতে পারে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পেতে।
সরকারের লক্ষ্য ও বিরোধিতা
ব্রিটিশ সরকারের এই ব্যাপক পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রের ওপর অভিবাসীদের নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো। আইএলআর পাওয়ার পরও অভিবাসীদের সরকারি বেনিফিট বা পাবলিক ফান্ডের সুবিধা সীমিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষের স্বাক্ষর করা একটি সংসদীয় পিটিশন সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, যেন আইএলআর ধারীদের ক্ষেত্রেও আর্থিক স্বনির্ভরতার শর্ত আরও কঠোর করা হয়।
এই পিটিশনের সমর্থকদের দাবি, এতে সরকারের বছরে কয়েক বিলিয়ন পাউন্ড সাশ্রয় হবে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠু বন্টন নিশ্চিত হবে। তবে অনেক অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞ এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাদের মতে, দক্ষ কর্মীদের বেনিফিট থেকে বঞ্চিত করলে বা আইএলআর-এর সময়সীমা দ্বিগুণ করলে স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ খাত, হোটেল ও রেস্তোরাঁ ব্যবসার মতো জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ খাতে কর্মী সংকট আরও তীব্র ও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিক্রিয়া
নীতিনির্ধারণী এই বড় পরিবর্তন নিয়ে লন্ডনের ডেভিড রস নামের একজন স্থানীয় নাগরিক তার মতামত প্রকাশ করেছেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'গণতন্ত্রে জনগণ তেমন সরকারই পায় যা তারা প্রাপ্য। তাই মানুষ যদি সত্যিই পরিবর্তন চায়, তবে তাদের উচিত সংসদে নিজেদের সঠিক ও যোগ্য প্রতিনিধি নির্বাচন করা।'
অন্যদিকে ক্রয়োডনের বাসিন্দা কেন্নি কেনেথ তার অভিমত ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, 'অন্য কোনও দেশে গিয়েই ঘরবাড়ি বা সরকারি আয়ের প্রত্যাশা করা অকল্পনীয় ও অবাস্তব। প্রত্যেক দেশেরই নিজস্ব নীতি ও নিয়ম আছে, সেগুলো মেনে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।'
এই পরিবর্তন শুধু যুক্তরাজ্যে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্যই নয়, বরং সমগ্র বিশ্ব থেকে আসা অভিবাসীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে যারা দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাজ্যে বসবাস ও কাজ করার পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য এই নতুন নিয়মগুলো ব্যাপক চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।



