প্রবাসের স্বপ্নে পাগল ছেলে, ভূমধ্যসাগরে মৃত্যু: এক বাবার হৃদয়বিদারক কাহিনী
প্রবাসের স্বপ্নে পাগল ছেলে, ভূমধ্যসাগরে মৃত্যু

প্রবাসের স্বপ্নে পাগল ছেলে, ভূমধ্যসাগরে মৃত্যু: এক বাবার হৃদয়বিদারক কাহিনী

১৮ বছর কুয়েতে কাটানো বাবা আখলুছ মিয়া প্রবাসের কষ্ট জানতেন বলে চাইতেন তাঁর ছেলে শায়েক আহমদ লেখাপড়া করে দেশেই থাকুক। কিন্তু এলাকার অন্যান্য যুবকদের ইউরোপ যাওয়ার দৃষ্টান্ত দেখে শায়েকও পাগল হয়ে ওঠে। প্রথমে বাবা পাত্তা না দিলেও ধীরে ধীরে চাপ বাড়তে থাকে। শেষমেশ দুবছর আগে এক দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করে আখলুছ মিয়া কিছু জমি বিক্রি করে সাড়ে চার লাখ টাকা দেন ছেলেকে সার্বিয়ায় পাঠানোর জন্য। কিন্তু আজ না কাল, হবে-হচ্ছে করে করে আর কিছুই হয় না। পরে দেখা যায়, টাকাটাই মার খেয়েছে। চেষ্টা করেও দালালের কাছ থেকে টাকা উদ্ধার করা যায়নি।

গ্রিস যাওয়ার বায়না ও ভয়ঙ্কর গেম

এই ধাক্কা সামলানোর চেষ্টা করছিলেন আখলুছ মিয়া, এর মধ্যেই এলাকায় ইউরোপ যাওয়ার জন্য সবাই যেন পাগল হয়ে গেছে। আজ এ বাড়ি ছাড়ে, তো কাল আরেকজন। এবার শুরু হয় গ্রিসে যাওয়ার বায়না। শায়েকের সঙ্গী–সাথিরা কেউ কেউ যাবে বলে জানায়। কিন্তু বাবা প্রথমে রাজি হননি। প্রথমত, টাকা নেই। দ্বিতীয়ত, গেমে (কাঠ বা প্লাস্টিকের ছোট ছোট নৌকায় করে জান হাতে নিয়ে সাগরপথে লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়া) তাঁর ভয় ছিল। গেমে কত শত যুবকের মরার খবর তিনি জানতেন। তাদের এলাকার দুই ছেলে দুবছর আগে মারা গেছে। তাঁর বুক কাঁপত। কিন্তু তাঁর বুকের ধন শায়েক তো পাগল। যেকোনো মূল্যে বিদেশে তাকে যেতেই হবে। একপর্যায়ে বাবা রাজি হন। ভাবেন, যদি যেতে পারে, পরিবারের একটা গতি হবে। এমনিতে কত টানাটুনি করে চলেন, তার একটা উপায় হবে। অভাব কমবে।

লিবিয়ায় জিম্মি জীবন ও নির্যাতন

ইছগাঁওয়ের দালাল আজিজুল ইসলামের মাধ্যমে লিবিয়া হয়ে গ্রিসে যেতে আরও কয়েকজনের মৌখিক চুক্তি হয়। আখলুছ মিয়াও আলোচনা শুরু করেন। কিন্তু আগে টাকা লাগবে। এখন সাড়ে চার লাখ আর লিবিয়ায় যাওয়ার পর গেমে তোলার আগে বাকি সাড়ে সাত লাখ। তিনি সাড়ে চার লাখ টাকা দেওয়ার পর গ্রামের আরও কয়েকজনের সঙ্গে চার মাস আগে বাড়ি ছাড়ে শায়েক। প্রথমে সৌদি আরব, পরে কুয়েত, মিসর হয়ে লিবিয়া। কথা হয়, সেখান থেকে কাঠের বড় নৌকায় করে তাকে গ্রিসে পাঠানো হবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দালালেরা জানায়, লিবিয়ায় শায়েকরা ক্যাম্পে আছে। আসলে ওটা কোনো ক্যাম্প নয়। একটি ঘরে সবাইকে ঠেসে রাখা। খাবার কষ্ট, থাকার কষ্ট। একধরনের জিম্মি অবস্থা। অনেকের মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয়। টাকার জন্য মারধর করা হয়। সেই মারধরের ছবি, ভিডিও পাঠানো হয় যাতে দ্রুত টাকা পাঠানো হয়। টাকার জন্য শায়েককেও নির্যাতন করা হয়েছে। খাবার দেওয়া হতো না। মাঝেমধ্যে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন করে রাখা হতো। মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যেত। হঠাৎ অন্য কারও নম্বর থেকে ফোন করে বলত, ‘যোগাযোগ করার দরকার নেই, দোয়া কোরো।’ একবার তো শায়েক কান্নাকাটি শুরু করে, লিবিয়ার ক্যাম্প থেকে তাকে যেন দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করি। সে নাকি বাঁচবে না। কীভাবে আনব, দালাল তো পাত্তা দেয় না। এখন নাকি সময় শেষ। যেকোনো সময় গেম।

গেমের জন্য অপেক্ষা ও শেষ ট্র্যাজেডি

শায়েকের তাগাদা, ‘টাকা পাঠাও।’ দালালের চাপ, ‘টাকা দাও।’ আখলুছ মিয়া দিশাহারা হয়ে পড়েন। এর-ওর কাছে ধার চান, পাই না। পরে ঘরের গরু, জমি বিক্রি করে আরও সাড়ে সাত লাখ টাকা পাঠান। এরপর একদিন ফোন করে কান্নাকাটি শুরু করে ছেলে। একটা গেম মিস হয়ে গেছে। সাগরতীরে দৌড়াতে গিয়ে পায়ে আঘাত পেয়ে পড়ে গেছে। তাই যেতে পারেনি। তাকে সান্ত্বনা দেন বাবা। কিন্তু ভেতরে বুকটা ভেঙে যায়।

২১ মার্চ ফোন করে শায়েক। বলে, আজ একটা গেম আছে, তবে এটাতে মনে হয় যেতে পারবে না। ২৩ তারিখের গেমে যেতে পারবে। মনে মনে আল্লাহ–আল্লাহ জপেন বাবা। শায়েককে বলেন, ‘আব্বা, আর মনে অয় কথা অইত না। আমার ভাইবইনরে দেইখ্যা রাইক্কো। চিন্তা কইরো না, দোয়া কইরো।’ কিন্তু ২৩ মার্চ ফোনে তাকে পাওয়া যায় না। দালালও ফোন ধরে না। মনে অশান্তি শুরু হয়, কিছুই ভালো লাগে না। কাউকে ফোনে পাওয়া যায় না।

২৮ মার্চ বিকেলে এলাকার মানুষ শায়েকের খবর জানতে চায়। জিজ্ঞাসা করে, ‘শায়েক ভালা আছেনি?’ বাবার বুক–ধরফর শুরু হয়। পরে শোনেন, ২১ তারিখের গেমেই তাঁর শায়েক ছিল। নৌকায় পানি আর খাবারের অভাবে তাঁর কলিজার টুকরা মারা গেছে। তাকে শেষ দেখাটাও দেখতে পাননি।

এই ট্র্যাজেডি শুধু একটি পরিবারের নয়, এটি সমগ্র সমাজের জন্য একটি করুণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।