মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশি শ্রমিকদের মর্মান্তিক মৃত্যু ও নিরাপত্তা সংকট
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে বাংলাদেশি শ্রমিক মৃত্যু ও নিরাপত্তা সংকট

মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের জীবন বিপন্ন

সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও চলমান সংঘাত এক ভয়াবহ রূপ পরিগ্রহ করিয়াছে। গত বুধবার সকালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা শহরের আল রিফা এলাকায় আকাশপথে আগত এক ড্রোনের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে এক বাংলাদেশি শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হইয়াছে। এই ঘটনাটি মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা ঝুঁকির একটি মর্মস্পর্শী উদাহরণ।

যুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রাণহানি ও আহতের সংখ্যা বৃদ্ধি

নূতন করিয়া ইরান যুদ্ধ শুরু হইবার পর হইতে এই পর্যন্ত আরব আমিরাতে পাকিস্তান, নেপাল, ভারত ও ফিলিস্তিনি নাগরিকসহ অন্তত আট জন সাধারণ মানুষ প্রাণ হারাইয়াছেন। কেবল আরব আমিরাতেই গত এক মাসে বিভিন্ন দেশের ১৮৮ জন নাগরিক আহত হইয়াছেন, যাহাদের মধ্যে বাংলাদেশি শ্রমিকের সংখ্যাও নগণ্য নহে। অন্যদিকে, বাহরাইনেও কর্মস্থল হইতে ফিরিবার পথে গোলার স্পিন্টারের আঘাতে এ এম তারেক নামক এক বাংলাদেশি যুবক নিহত হইয়াছেন।

বিদেশের মাটিতে উন্নত জীবনের সন্ধানে গিয়া এইরূপে অকালে প্রাণ হারানো কেবল শোকাবহ নহে, বরং এক গভীর উদ্বেগের কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচও (এইচআরডব্লিউ) এই ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করিয়াছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মধ্যপ্রাচ্যে অভিবাসী শ্রমিকদের জীবনযাত্রার চরম সংকট

বর্তমানে ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার আবর্তে কাটিতেছে অভিবাসী জীবন। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) দেশসমূহে কর্মরত লক্ষ লক্ষ অভিবাসী শ্রমিক আজ চরম নিরাপত্তার পাশাপাশি জীবিকা সংকটেও নিপতিত হইয়াছেন। আকাশপথে অতর্কিত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শ্রমিকদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করিয়াছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিশেষ করিয়া যাহারা ডেলিভারি সেবা, পরিবহন ও হাসপাতালে জরুরি কর্মে নিয়োজিত, তাহারা প্রতিমুহূর্তে মৃত্যুভয় সঙ্গে লইয়া রাস্তায় বিচরণ করিতেছেন। যুদ্ধের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য ইতিমধ্যে দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাইয়াছে, যাহার ফলে স্বল্প আয়ের শ্রমিকদের জীবনধারণ কষ্টসাধ্য হইয়া পড়িয়াছে।

কর্মসংস্থান হ্রাস ও আর্থিক দুরবস্থা

অনেক ক্ষেত্রে হোটেল ও হসপিটালিটি সেক্টরে কর্মী ছাঁটাই চলিতেছে কিংবা বেতনহীন ছুটিতে পাঠানো হইতেছে। চড়া সুদে ঋণ লইয়া বিদেশ যাওয়া শ্রমিকেরা আজ কাজ হারাইয়া নিঃস্ব হইবার উপক্রম হইয়াছেন। 'কাফালা' (স্পনসরশিপ) ব্যবস্থার বেড়াজালে আটকা পড়িয়া একদিকে আয় হ্রাস পাইয়াছে, অন্যদিকে নিয়োগকর্তাকে নির্দিষ্ট ফি প্রদানের বাধ্যবাধকতা তাহাদের জীবনকে দুর্বিষহ করিয়া তুলিয়াছে।

সরকারি পদক্ষেপ ও করণীয় বিষয়সমূহ

উপরিউক্ত সংকট উত্তরণে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট মহলের আশু করণীয় লইয়া সরকারের দিক-নির্দেশনা দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করিয়া এই সংকটময় মুহূর্তে প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। বাংলাদেশ দূতাবাস ও সরকারকে অবিলম্বে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির সহিত দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করিতে হইবে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যেই সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করা সমীচীন বলিয়া আমরা মনে করি, তাহা হইল:

  • ইরান যুদ্ধের কারণে অভিবাসী শ্রমিকরা যেন হতাহত না হন, এই জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা লইতে হইবে। তাহাদের অরক্ষিত অবস্থায় ছাড়িয়া দেওয়া যাইবে না।
  • নিহত শ্রমিকদের পরিবার যাহাতে যথাযথ ক্ষতিপূরণ পায় এবং ভবিষ্যতে সকল শ্রমিকের জন্য বাধ্যতামূলক জীবন বিমা চালু করা যায়, সেই লক্ষ্যে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালাইতে হইবে।
  • শ্রমিকদের নিজ ভাষায় নিয়মিত নিরাপত্তা বুলেটিন ও জরুরি অবস্থায় করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনা প্রদান করিতে হইবে।
  • মরদেহ ও কর্মহীনদের প্রত্যাবাসন লইয়াও ভাবিতে হইবে। নিহতদের মরদেহ রাষ্ট্রীয় খরচে দ্রুত দেশে ফিরাইয়া আনা এবং যাহারা কাজ হারাইয়া ফিরিতে ইচ্ছুক, তাহাদের বিমান টিকিটের ব্যবস্থা নিশ্চিত করিতে হইবে।

আইনি ও আর্থিক সহায়তার গুরুত্ব

বিশেষত আইনি ও আর্থিক সহায়তার ব্যাপারে এই মুহূর্তে গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন। নথিপত্রহীন বা 'ফ্রি' ভিসায় থাকা অসহায় শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা প্রদান এবং ঋণের ভারে জর্জরিতদের বিশেষ প্রণোদনা প্রদানের বিষয়টি বিবেচনা করিতে হইবে।

পরিশেষে বলিবার অপেক্ষা রাখে না যে, রেমিট্যান্স-যোদ্ধাদের জীবনের মূল্য যে কোনো ভূরাজনৈতিক সমীকরণের ঊর্ধ্বে। তাহাদের জানমালের নিরাপত্তা বিধানে সরকারকে দ্রুত ও দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে।