মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে ঝুঁকিতে বাংলাদেশের প্রবাসী আয়, ছয় উপসাগরীয় দেশের ওপর নির্ভরতা উদ্বেগজনক
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে প্রবাসী আয়ের ঝুঁকি, ছয় দেশের ওপর নির্ভরতা

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে প্রবাসী আয়ের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উদ্বেগ

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ যতই জটিল আকার ধারণ করছে, বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের আকাশে ততই কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। এর প্রধান কারণ হলো, দেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় অর্ধেকই আসে ছয়টি উপসাগরীয় দেশ থেকে। যদিও বর্তমানে যুদ্ধের প্রভাব সত্ত্বেও প্রবাসী আয় আসার গতি সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে, তবে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের আশঙ্কায় অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন।

উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর প্রবাসী আয়ের বিশাল নির্ভরতা

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, বাহরাইন ও কুয়েত—এই ছয়টি তেলসমৃদ্ধ দেশ থেকেই সর্বোচ্চ প্রবাসী আয় আসে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে জুলাই-সেপ্টেম্বরে মোট প্রবাসী আয়ের ৪৫ শতাংশ এসেছিল এই অঞ্চল থেকে, যা দ্বিতীয় প্রান্তিক অক্টোবর-ডিসেম্বরে বেড়ে ৪৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। উল্লেখ্য, করোনাকালে ২০২০-২১ অর্থবছরে এই হার ছিল ৬০ শতাংশ, তারপর থেকে তা ধারাবাহিকভাবে কমেছে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে মোট ৮৬৭ কোটি মার্কিন ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে, যার মধ্যে উপসাগরীয় ছয় দেশ থেকে আসে ৪৮০ কোটি ডলার বা ৪৭ শতাংশ। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে সর্বোচ্চ অর্থ পাঠানো হয়েছে—সৌদি আরব থেকে ১৩১ কোটি ডলার এবং ইউএই থেকে ১১৮ কোটি ডলার। এছাড়া ওমান থেকে ৫১ কোটি, কাতার থেকে ৪২ কোটি, কুয়েত থেকে ৪৪ কোটি এবং বাহরাইন থেকে ২৩ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অন্যান্য অঞ্চল থেকে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ

উপসাগরীয় দেশগুলোর পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রবাসী আয় আসে, যা দ্বিতীয় প্রান্তিকে ১৭০ কোটি ডলার বা ১৯.৬১ শতাংশ। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসে ১৫.৬০ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৭.৫৯ শতাংশ। বাকি ১০ শতাংশ প্রবাসী আয় বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে আসে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শ্রমিক প্রেরণ ও কর্মী সংখ্যার বিশ্লেষণ

উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে প্রবাসী আয় আসার বড় কারণ হলো এসব দেশে নতুন শ্রমিক যাওয়ার হার বেশি। গত বছর বাংলাদেশ থেকে মোট ১১ লাখ ১৬ হাজার শ্রমজীবী মানুষ বিদেশে গেছেন, যার মধ্যে শুধু সৌদি আরবেই গেছেন ৭ লাখ ৪৩ হাজার। এছাড়া কাতারে ১ লাখ ৭ হাজার, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৩ হাজার এবং কুয়েতে ৪০ হাজার শ্রমিক পাড়ি জমিয়েছেন।

প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুসারে, বর্তমানে উপসাগরীয় ছয় দেশে প্রায় ৪৪ লাখ বাংলাদেশি কর্মী রয়েছেন। সৌদি আরবে প্রায় ২০ লাখ, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১০ লাখ, ওমানে ৭ লাখ, কাতারে ৪ লাখ ৫০ হাজার, বাহরাইনে ১ লাখ ৫০ হাজার এবং কুয়েতে ১ লাখ ৪০ হাজার বাংলাদেশি কাজ করছেন।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন উপসাগরীয় দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলার ঘটনা ঘটেছে, এবং এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত পাঁচজন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন।

ঈদের আগে প্রবাসী আয় আসার গতি আশাব্যঞ্জক ছিল—চলতি মাসের প্রথম দুই সপ্তাহে মোট ২২০ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে, যার মধ্যে দ্বিতীয় সপ্তাহেই ১১৩ কোটি ডলার জমা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক সতর্ক করে দিয়েছে যে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রবাসী আয়ের গতি কমতে পারে। ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি বলেছে, প্রবাসী আয় আসার মসৃণতা নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের স্থায়িত্বের ওপর। যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলে প্রভাব কম পড়বে, কিন্তু দীর্ঘদিন চললে প্রবাসী আয় উল্লেখযোগ্য হারে কমবে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চাপ বাড়বে।

সামগ্রিকভাবে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য এখনই নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে, যাতে যুদ্ধের প্রভাবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা যায়।