প্রবাসে রমজানের স্মৃতি: পরিবার ছাড়া ইফতারের জমাট অনুভূতি
প্রবাসে রমজান: পরিবার ছাড়া ইফতারের অনুভূতি

প্রবাসে রমজানের স্মৃতি: পরিবার ছাড়া ইফতারের জমাট অনুভূতি

পবিত্র রমজান মাস ঘুরে আবার এসেছে, প্রায় শেষ হতে চলেছে। আসন্ন ঈদের প্রস্তুতিতে সবাই ব্যস্ত। কিন্তু যারা দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাইরে আছেন, জীবনের নানাবিধ ব্যস্ততা আর চারপাশের বাস্তবতার কারণে রমজান বা ঈদের আনন্দটা ঠিক সেভাবে অনুভব করা যায় না। যতই বাংলাদেশি কমিউনিটির লোকজন চারপাশে থাকুক, পরিবার বা আত্মীয়স্বজন ছাড়া ইফতারের আয়োজন কি জমে? রোজার মাস এলেই তাই মনে পড়ে যায় আগেকার দিনগুলো।

শৈশবের রমজান: যৌথ পরিবারের উৎসবমুখর আবহ

শান্তিনগরের পৈতৃক বাড়িতে যৌথ পরিবারে বেড়ে ওঠা। সেই সময়ে প্রতিদিনই যেন উৎসবের আবহ। সন্ধ্যাবেলা দূর থেকে সাইরেন বাজা আর পাশের মসজিদ থেকে মাগরিবের আজান শুনে বুঝতাম ইফতারের সময় হয়েছে। আশির দশকের শেষের দিকের কথা বলছি। তখন ইফতার ছিল সাদামাটা; ছোলা, বেগুনি, আর কখনো দাদির হাতে তৈরি হালিম। আশেপাশের বাসা থেকে ইফতার আসত, আমরাও পাঠাতাম। পাড়ার সংস্কৃতি তখনো সমৃদ্ধ ছিল। ইফতারের পরপরই নেমে আসত এক নীরবতা, পুরো পাড়া মগ্ন হয়ে যেত নামাজ আর ইবাদতে।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলানো দৃশ্যপট

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলাতে শুরু করল দৃশ্যপট। স্কুল শেষে বা বিকেলে আব্বুর সঙ্গে বের হতাম ইফতার কিনতে। বেইলি রোড বা পুরান ঢাকার দোকান থেকে কেনা হতো রকমারি খাবার। তারপর সবাই মিলে একসঙ্গে বসে ইফতার। আর পনেরো রোজার পরপরই ঈদের আনন্দের উত্তেজনা, যার সঙ্গে তুলনা চলে না।

প্রবাসের বাস্তবতা: রোজার আমেজ খুঁজে পাওয়া যায় না

আজ বাস্তবে ফিরে দেখি, অফিসে বসে আছি, পাশের সহকর্মীরা লাঞ্চে যাচ্ছে। বিদেশের মাটিতে রোজার আমেজ খুঁজে পাওয়া যায় না, সেটা আশা করাও উচিত নয়। এসবের মধ্যে সংযম আর ধৈর্য ধারণ করাই এক রকম ইবাদত। দেশে এখন রমজান অনেক বড় করে পালন হয়; ইফতার বাজার, সাহ্‌রি নাইটস, চাঁদরাতের অনুষ্ঠান, আর সেই সঙ্গে ট্রাফিক জ্যাম। কিন্তু এই উৎসবমুখরতার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে আনন্দ, বাসায় ফেরার তাড়া, প্রতিদিন নতুন ইফতারি বানানো, রাতে তাড়াহুড়া করে উঠে সাহ্‌রি খাওয়া। সবাই মিলে চাঁদ দেখতে ছাদে ওঠা। প্রবাসজীবনে সেই আনন্দের ছোঁয়া পাওয়া যায় না।

পরিবারের সদস্যদের ছড়িয়ে থাকা: মন ছুটে যেতে চায় দেশে

আজ পরিবারের সদস্যরা ছড়িয়ে আছে একেক দেশে। আমি এক দেশে, ছোটবোন আরেক দেশে। যেখানে একসময় আমরা একই ঘরে থাকতাম, আজ আমাদের সময়রেখাও এক নয়। বছরের অন্য সময় অতটা না, কিন্তু রমজান আর ঈদের সময় মন ছুটে যেতে চায় দেশে। এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

জীবন চলতে থাকে: দোয়া ও শুভেচ্ছা

তবু জীবন চলতে থাকে। প্রতিবছরই দোয়া করি দেশটা ভালো থাকুক, আরেকটা রমজান মাস যেন পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে কাটাতে পারি। সবাইকে পবিত্র ঈদের আগাম শুভেচ্ছা।

লেখক: মুনিরা রহমান, হংকং থেকে