লন্ডনের বাংলাদেশ হাউস: ইতিহাসের স্মারক বিক্রি, প্রবাসীদের হতাশা
উত্তর লন্ডনের ইজলিংটনের হাইবেরি হিলের ৯১ নম্বর বাড়িটি একসময় বাংলাদেশ হাউস নামে পরিচিত ছিল। এই ভবনটি পাকিস্তান আমলে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বাংলাদেশিদের অর্থে কেনা হয়েছিল, যা পরে বাংলাদেশ সরকারকে উপহার দেওয়া হয়। কিন্তু যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনটি বিক্রি করে দেওয়া হয়, এবং গত দুই দশকেও প্রতিশ্রুত বাংলাদেশ কালচারাল সেন্টার গড়ে তোলা হয়নি।
ইস্ট পাকিস্তান হাউস থেকে বাংলাদেশ হাউস: একটি ঐতিহাসিক যাত্রা
১৯৬৪ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানি শিক্ষার্থী ও প্রবাসীদের অনুদানে এই বাড়িটি কেনা হয়েছিল, যার নাম দেওয়া হয়েছিল ইস্ট পাকিস্তান হাউস। মুক্তিযুদ্ধের সময় এটি রাজনৈতিক সংগঠন ও সংহতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে ভবনটির নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ হাউস রাখা হয় এবং এটি প্রবাসী কমিউনিটির স্মারক হিসেবে টিকিয়ে রাখার শর্তে বাংলাদেশ সরকারকে উপহার দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ হাউসের বিক্রি ও প্রতিশ্রুতির অপূর্ণতা
১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ হাইকমিশন ভবনটি ৪ লাখ ৮৫ হাজার পাউন্ডে বিক্রি করে দেয়, যা বর্তমান বিনিময় হারে প্রায় ৭ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এই বিক্রির সময় কথা ছিল, আরেকটি ভবন কিনে বাংলাদেশ কালচারাল সেন্টার গড়ে তোলা হবে। সে অনুযায়ী ২০০০ সালে পূর্ব লন্ডনের মাইলএন্ডে ৪৪ কোবার্ন রোডে আরেকটি ভবন কেনা হয়, কিন্তু ২০০৪ সালে সেটিও বিক্রি করে দেওয়া হয়।
বাড়ি বিক্রির অর্থ ব্যাংকে জমা রাখা হয়েছে বলে হাইকমিশন জানালেও, ঠিক কত টাকা আছে বা কীভাবে ব্যবহৃত হবে, সে বিষয়ে কোনো স্বচ্ছতা দেখা যায়নি। সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ হাউসটি সংরক্ষিত থাকলে আজ তার বাজারমূল্য দাঁড়াত প্রায় ৪০ লাখ পাউন্ড বা ৬৫ কোটি টাকার বেশি।
প্রবাসীদের ক্ষোভ ও হাইকমিশনের প্রতিক্রিয়া
লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি নবাব উদ্দিনের মতো কমিউনিটি নেতারা হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থে কেনা এই ভবন, যা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও ঐক্যের প্রতীক ছিল, তার বিক্রয়লব্ধ অর্থ কার্যকর উদ্যোগে ব্যবহার না হওয়া দায়িত্বশীলতার ঘাটতি। নবাব উদ্দিন বলেন, শুধু অর্থ ব্যাংকে আছে বললেই দায়িত্ব শেষ হয় না, প্রয়োজন স্বচ্ছ হিসাব ও স্পষ্ট পরিকল্পনা।
বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার আকবর হোসেন ই–মেইলে জানিয়েছেন, ভবন বিক্রির অর্থ হাইকমিশনের অ্যাকাউন্টে গচ্ছিত আছে এবং সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে অর্থের সঠিক পরিমাণ বা বিনিয়োগের বিবরণ প্রকাশ করেননি তিনি।
দুই দশকের আশ্বাস ও বাস্তবতা
বাড়ি বিক্রির পর গত দুই দশকে অন্তত সাতজন রাষ্ট্রদূত বদলেছেন, যাঁরা সবাই সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার আশ্বাস দিলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি। ২০২০ সালে হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনিমও বিষয়টি বিবেচনায় আছে বলে জানালেও, ২০২৪ সালে তাঁর বিদায়ের পরও দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি।
এই অবস্থায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের মনে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে, কারণ তাঁদের ঐতিহাসিক সম্পদ রক্ষায় হাইকমিশনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।
