সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় টাঙ্গাইলের প্রবাসী নিহত
সৌদি আরবের আল-খার্জ গভর্নরেটে একটি আবাসিক ভবনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত হয়েছেন টাঙ্গাইলের প্রবাসী মোশাররফ হোসেন (৩৮)। এই মর্মান্তিক ঘটনায় তার পরিবারের উপর নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। নিহত মোশাররফ হোসেন টাঙ্গাইলের সখিপুর উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নের কীর্তনখোলা মধ্যপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন।
হামলার সময় ও স্থান
রবিবার বাংলাদেশ সময় রাত প্রায় ৯টায় সৌদি আরবের আল-খার্জ গভর্নরেটের একটি আবাসিক কমপ্লেক্সের ভবনে এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সংঘটিত হয়। সৌদি সিভিল ডিফেন্স এজেন্সি সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ একটি পোস্টের মাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। হামলার সময় স্থানীয় সময় বিবেচনায় সন্ধ্যা নামছিল, এবং অনেক পরিবার ইফতারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
পরিবারের সাথে শেষ কথোপকথন
পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় সূত্রগুলো থেকে জানা যায়, মোশাররফ হোসেন প্রায় আট বছর আগে কাজের সন্ধানে সৌদি আরবে পাড়ি জমান। তিনি সর্বশেষ দুই বছর আগে বাংলাদেশে ফিরেছিলেন। মৃত্যুর মাত্র আধা ঘণ্টা আগে তিনি তার বড় ছেলে মাহিমের সাথে ভিডিও কল করেছিলেন।
মোশাররফের বড় ছেলে মাহিম (১৪) স্থানীয় একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী, আর ছোট ছেলে মিহান (৭) একটি মাদ্রাসার প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। মাহিম জানায়, রবিবার রাত প্রায় ৮:৩০টায় তিনি তার বাবার সাথে ভিডিও কল করেন। কথোপকথনের সময় তার বাবা তাকে ঈদের জন্য জামাকাপড় কিনতে বলেছিলেন এবং ইফতারের পর টাকা পাঠানোর আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু ইফতারের সময় মোশাররফ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত হন।
পরিবারের করুণ অবস্থা
মোশাররফের স্ত্রী কোবোরী আক্তার কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, "আমি গত রাত প্রায় ৭টায় তার সাথে শেষ কথা বলেছিলাম। এখন আমি কীভাবে এই দুই সন্তানকে মানুষ করব? আমাদের দেখবে কে?" সোমবার কীর্তনখোলা গ্রামের তাদের বাড়িতে গেলে দেখা যায়, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড় জমেছে। অনেক নারী উপস্থিত ছিলেন। মোশাররফের মা, তার একমাত্র বোন মোরশেদা এবং স্ত্রী কোবোরী আক্তারকে অশ্রু সংবরণ করতে না পেরে কাঁদতে দেখা গেছে, আর প্রতিবেশীরা তাদের সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন।
পিতার আকুতি ও সরকারি পদক্ষেপ
মোশাররফের বাবা সুজাত আলী বলেন, "আমি আর কখনো আমার ছেলেকে দেখতে পাব না। অন্তত তার দেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হোক, যাতে শেষবারের মতো তাকে দেখতে পারি। আমি সরকারের কাছে দ্রুত তার দেহ ফিরিয়ে আনার অনুরোধ করছি।"
এদিকে, সখিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল রনি সোমবার সকাল প্রায় ১০:৩০টায় মোশাররফের বাড়িতে গিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সাথে সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেহ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সরকার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সব ধরনের সহায়তা প্রদান করবে।
প্রবাসী জীবনের সংগ্রাম
মোশাররফ হোসেনের মতো লক্ষাধিক বাংলাদেশি প্রবাসী বিদেশে জীবিকার তাগিদে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। এই ঘটনা প্রবাসী কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। পরিবারটি এখন অপেক্ষায় আছে তাদের প্রিয়জনের দেহ ফিরে পাওয়ার জন্য, আর স্থানীয় সম্প্রদায় শোক ও সহমর্মিতায় একত্রিত হয়েছে।



