বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত প্রবাসী আবুল মহসিন, সহকর্মী আহত
বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত প্রবাসী আবুল মহসিন

বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত প্রবাসী আবুল মহসিনের করুণ গল্প

প্রবাস জীবনের ৩২ বছরে এমন ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি আগে কখনো হইনি বলে জানিয়েছেন বাহরাইনে কর্মরত বাংলাদেশি এস এম নুর হোসেন। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনার পর ২ মার্চ রাতে বাহরাইনে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে তেহরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত হয়েছেন তার জ্যাঠাতো ভাই আবুল মহসিন।

ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে প্রাণহানি ও আহতের ঘটনা

আবুল মহসিন বাহরাইনের রাজধানী মানামার আরসি ড্রাইডক প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। ওই দিন তার সঙ্গে কাজ করছিলেন মোহাম্মদ নাজিম নামের আরেক বাংলাদেশি। ক্ষেপণাস্ত্রটি সরাসরি মহসিনের মাথায় আঘাত হানে। নাজিম তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসায় তার হাত ও মুখে গুরুতর আগুনের আঘাত লাগে। বর্তমানে নাজিম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছেন।

নুর হোসেনের ভাষায়, "মহসিন ও নাজিম দুজনই আমার সঙ্গে একই রুমে থাকতেন। আজ একজন পৃথিবী থেকে চলে গেছেন, আরেকজন কাতরাচ্ছেন হাসপাতালে। তাদের খাট ও জিনিসপত্র দেখলে নিজেকে সামলে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।"

আতঙ্কে কাজে যাচ্ছেন না প্রবাসীরা

এই ঘটনার পর থেকে নুর হোসেনসহ একই রুমে থাকা আজিমুল ইসলাম, আবুল কাশেম ও নাছির উদ্দিন কাজে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। কোম্পানি ৪ মার্চ কাজ করার জন্য ডাকলেও আতঙ্কের কারণে তারা যাননি। এক শিফটে সাধারণত ৪০০ থেকে ৫০০ জন কাজ করলেও বর্তমানে মাত্র ১০ থেকে ১২ জন কর্মস্থলে উপস্থিত হচ্ছেন।

আতঙ্কের প্রধান কারণ হলো, তাদের কর্মস্থল মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। লক্ষ্যচ্যুত ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আশপাশের এলাকায় পড়ছে কিংবা প্রযুক্তির সাহায্যে ধ্বংস করা হচ্ছে। দিনে ২০ থেকে ২৫টি ক্ষেপণাস্ত্রের বিকট শব্দে স্থানীয়দের বুক কেঁপে উঠছে।

পরিবারের জন্য শঙ্কা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

নুর হোসেন ৪ মার্চ দুপুরে হাসপাতালে গিয়ে মহসিনের লাশ দেখেন। তিনি বলেন, "কফিনের ভেতর তার লাশ দেখে আমি কথা বলতে পারিনি, শুধু চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল। ১৯৯৩ সালে আমরা একসঙ্গে বাহরাইন এসেছিলাম। সে আমার ছোট ছিল, কিন্তু আমার আগেই চলে গেল। দেশে তার স্ত্রী ও সন্তানদের কথা ভেবে আমি ভেঙে পড়ছি।"

মহসিনের মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। ফ্লাইট চলাচল স্বাভাবিক ও দূতাবাসের কার্যক্রম শেষ হলে তা দেশে পাঠানো হবে।

যুদ্ধ পরিস্থিতির ভয়াবহতা ও উদ্বেগ

দিন দিন যুদ্ধ পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠছে বলে উল্লেখ করেছেন নুর হোসেন। তিনি জানান, "এভাবে কত দিন রুমের মধ্যে বসে থাকতে হবে, তা আমি জানি না। কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, তা বুঝতেও পারছি না। আমাদের পরিবারের সদস্যরাও বাংলাদেশে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকে দেশে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন, কিন্তু দেশে গিয়ে আমরা কী করব?"

এই ঘটনা প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে গভীর শোক ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করছে।