মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত: প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তায় সরকারের জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন
মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা উদ্বেগ

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা: প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তীব্র

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা এবং ইরানের পাল্টা হামলার কারণে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যে সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তাতে সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিক ও তাঁদের পরিবারবর্গের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক বলে বিবেচিত হচ্ছে। আধুনিক যুদ্ধবিমান, ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্রভিত্তিক এই সংঘাতের ধ্বংসযজ্ঞ যেমন ব্যাপক এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, তেমনি সাধারণ নাগরিকদের জন্য ঝুঁকির মাত্রাও অনেকাংশে বেড়ে গেছে।

ইরানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও প্রবাসীদের অবস্থান

বর্তমানে ইরানে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থীসহ মোট কয়েক শ বাংলাদেশি নাগরিক অবস্থান করছেন। অন্যদিকে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ৫০ লাখেরও বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন। গত সোমবার পর্যন্ত এই সংঘাতের কারণে দুজন বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার দুঃখজনক খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারকে প্রবাসী নাগরিকদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিবেচনায় নেওয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

সংঘাতের বিস্তার ও আন্তর্জাতিক প্রভাব

পরমাণু চুক্তি নিয়ে চলমান আলোচনার মধ্যেই শনিবার ইরানে যৌথভাবে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ রাজনীতিবিদ ও সামরিক নেতৃত্ব নিহত হন। এরপর দফায় দফায় তারা ইরানে হামলা চালাতে থাকে। ইরান পাল্টা হামলা হিসেবে ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে। এই হামলায় মার্কিন সেনা ও ইসরায়েলি নাগরিকদের পাশাপাশি অন্যান্য দেশের নাগরিকদের হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

গত বছরের জুন মাসে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম দফা সংঘাতের তুলনায় বর্তমান দফার সংঘাতের ব্যাপকতা ও মাত্রিকতা যে আরও অনেক বেশি, তা প্রথম তিন দিনেই স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়েছে। সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, জর্ডানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ইরান হামলা চালিয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলো এই সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়বে কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা

যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সের মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোরও চলমান সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই অবস্থায় জাতিসংঘ, ওআইসিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বহুপক্ষীয় সংস্থা এবং বিশ্বের বড় শক্তিগুলো যদি উত্তেজনা প্রশমন ও সংঘাত বন্ধে জরুরি ও কার্যকরী উদ্যোগ না নেয়, তাহলে সমগ্র বিশ্ব আরও বড় বিপর্যয়কর যুদ্ধের মধ্যে ঢুকে পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে করণীয়

চলমান সংঘাত পরিস্থিতিতে প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে জানিয়েছে যে, ইরানে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা এখন পর্যন্ত সবাই নিরাপদে আছেন। তবে তাঁদের যাতে নিরাপদে সরিয়ে আনা যায়, সে জন্য আগেভাগেই যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণ করা প্রয়োজন।

এবারের সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ আক্রান্ত হওয়ায় বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তাঝুঁকির মাত্রাটা অনেক বেড়ে গেছে। রোববার সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের হামলায় যে তিনজন নাগরিক নিহত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশের নাগরিক সালেহ আহমেদ রয়েছেন। বাহরাইনে আবুল মহসিন নামের আরেক বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন।

দূতাবাসগুলোর ভূমিকা ও পরামর্শ

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যাতে ঝুঁকিপূর্ণ ও সংঘাতপ্রবণ এলাকাগুলো এড়িয়ে চলতে পারে, সে জন্য বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোকে নিয়মিতভাবে সেই পরামর্শ প্রদান করতে হবে। আহত ব্যক্তিরা যাতে পর্যাপ্ত ও সময়োপযোগী চিকিৎসা সেবা পান, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সর্বোপরি বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোকে দেশের নাগরিকদের পাশে জোরালোভাবে দাঁড়াতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা প্রদান করতে হবে।

যাতায়াত ও ভিসা সংকট

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত পরিস্থিতির কারণে মাত্র তিন দিনে ঢাকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যগামী প্রায় ১০২টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকেও বাংলাদেশে আসতে পারেননি অনেক নাগরিক। সব মিলিয়ে কয়েক হাজার মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছেন। ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে আসায় তাঁদের অনেকেরই বিদেশে কাজ করতে যাওয়ার স্বপ্নে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে কয়েকটি দেশের কূটনীতিকদের কাছে সহযোগিতা কামনা করেছে। ভিসাসংক্রান্ত জটিলতায় বিদেশগামীরা যাতে কোনো সংকটে না পড়েন, তার জন্য সরকারকে আরও জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো প্রয়োজন। দেশে ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বিমানবন্দরগুলোতে আটকে পড়া যাত্রীদের দেখভালে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

অর্থনৈতিক ঝুঁকি ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিসহ নানা অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের মাত্রা, ব্যাপকতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়েই সরকারকে সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলার জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।