সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় পরিবার হারানো ফাইজা: এখনো অপেক্ষায় মা-বাবার ফেরার
সৌদি দুর্ঘটনায় পরিবার হারানো ফাইজা: অপেক্ষায় মা-বাবার ফেরার

সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় পরিবার হারানো ফাইজা: এখনো অপেক্ষায় মা-বাবার ফেরার

ওমরাহ শেষে ফেরার পথে সৌদি আরবে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় তছনছ হয়ে গেছে একটি বাংলাদেশি পরিবার। বেঁচে আছে কেবল আট বছরের ফাইজা আক্তার, যার শরীরে এখনো দুর্ঘটনার ক্ষতচিহ্ন স্পষ্ট। একাই বেঁচে ফিরল সে, কিন্তু সৌদিতে নিভে গেছে তার পুরো পরিবার। আজ সোমবার সকালে মামার সঙ্গে সৌদি আরব থেকে লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায় ফাইজা। তার ছোট্ট শরীরে এখনো দুর্ঘটনার জখমের দাগ, হাঁটাচলায় কষ্টের ছাপ স্পষ্ট। দুর্ঘটনার ভয়াবহতার কারণে কথাও বলছে খুব কম এই শিশুটি।

ফাইজার সরল বিশ্বাস: মা-বাবা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন

ফাইজা আক্তার রামগঞ্জ টিউরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। সে রামগঞ্জ উপজেলার ভাটরা ইউনিয়নের নলচরা গ্রামের ওশিম উদ্দিন ব্যাপারী বাড়ির বাসিন্দা। স্বজনেরা জানিয়েছেন, বাবা–মা ও দুই বোনের মৃত্যুর খবর এখনো তাকে জানানো হয়নি। সে জানে, দুর্ঘটনার পর তারা হাসপাতালে ভর্তি আছেন। মাঝেমধ্যে সে মাকে খোঁজে, বাবার কথা জিজ্ঞেস করে। উত্তর দিতে গিয়ে স্বজনদের চোখ ভিজে ওঠে, কিন্তু সত্যটা বলতে পারেন না কেউ।

আজ দুপুরে সংবাদকর্মীদের সঙ্গে কথা বলার সময় ফাইজা সরল বিশ্বাসে জানায়, তার মতোই বাবা, মা ও বোন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং শিগগিরই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবে। এরপর সবাই মিলে ঈদ উদ্‌যাপন করবে। নতুন জামা পরে সে বাবার সঙ্গে ঈদের মেলায় যাবে। সঙ্গে থাকবে তার দুই বোন। ঈদের দিন তারা অনেক আনন্দ করবে—এই স্বপ্নই দেখছে ফাইজা।

দুর্ঘটনার ভয়াবহ বিবরণ

১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সময় রাত তিনটার দিকে সৌদি আরবের আবহা শহরে ওমরাহ পালন শেষে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয় তাদের গাড়ি। এতে ফাইজার বাবা মিজানুর রহমান (৪২), মা মেহের আফরোজ সুমি (৩০), বড় বোন মোহনা (১৩) ও দেড় বছরের শিশু সুবাহসহ পাঁচ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনায় পুরো পরিবার প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, রেখে যায় শুধু ফাইজাকে।

তার মামা তানভীর হোসেন জানান, ফাইজাকে নিয়ে গতকাল বেলা সাড়ে তিনটায় সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দেন। পুরো যাত্রাপথ সে নিস্তব্ধ ছিল। শিশুটি এখনো জানে না তার পৃথিবী ভেঙে গেছে, সে হয়তো অপেক্ষা করছে—হাসপাতাল থেকে মা–বাবা ও বোনেরা ফিরবে। তিনি আরও বলেন, নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ এখনো জেদ্দার হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। সেগুলো দেশে আনার প্রক্রিয়া চলছে, যা পরিবারের জন্য আরেকটি কষ্টের অধ্যায়।

সম্প্রদায়ের শোক ও সহমর্মিতা

এই দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় সম্প্রদায়ে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ফাইজার স্কুল ও গ্রামের মানুষরা তার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। শিশুটির মানসিক স্বাস্থ্য ও শারীরিক পুনর্বাসনের জন্য সহায়তার আহ্বান জানানো হচ্ছে। এই ঘটনা সৌদি আরবে বাংলাদেশি প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এনেছে। ফাইজার মতো অসংখ্য শিশুর জীবন ঝুঁকিতে পড়ার এই দৃষ্টান্ত সমাজকে সচেতন করতে পারে।