রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত বাঙালি তরুণ মুহিবুর রহমান
রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে যুদ্ধে নিহত বাঙালি তরুণ

রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত বাঙালি তরুণ মুহিবুর রহমান

অভাব-অনটন দূর করে পরিবারের সবার মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে উচ্চতর পড়ালেখার উদ্দেশ্যে রাশিয়ায় পাড়ি জমান বাঙালি তরুণ মুহিবুর রহমান (২৩)। দিনকাল ভালোই চলছিল, কিন্তু একপর্যায়ে দেশে ফিরে বিয়ে করে আবার রাশিয়ায় গিয়ে তিনি যোগ দেন দেশটির সেনাবাহিনীতে। সবকিছু স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল, নিয়মিত পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন তিনি। হঠাৎ করেই সেই যোগাযোগে ছেদ পড়ে, অনেক দিন কারও সঙ্গে কথা বলেননি তিনি। গত শুক্রবার মুহিবুরের এক সহকর্মী ফোন করে স্বজনদের জানান, ইউক্রেনে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ড্রোন হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন তিনি। এই আকস্মিক মৃত্যুসংবাদে পরিবারে আলোর বদলে ঘনিয়ে এসেছে গভীর শোকের মেঘ।

গ্রামজুড়ে বিষণ্নতার ছায়া

মুহিবুর রহমান মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আমতৈল ইউনিয়নের সম্মদপুর গ্রামের মসুদ মিয়ার ছেলে। আজ বুধবার সকালে সম্মদপুর গ্রামে যাওয়ার পর গ্রামজুড়ে এক বিষণ্ন পরিবেশ লক্ষ্য করা গেল। গ্রামের ভেতর ঢুকে কাঁচা পথ ধরে কাঁধে কোদাল নিয়ে একজনকে আসতে দেখা গেল। মুখোমুখি হয়ে মসুদ মিয়ার বাড়ি কোথায় জানতে চাইলে তিনি কিছুটা থমকে গেলেন—যেন আকাশের মেঘ তাঁর চেহারায় নেমে এসেছে। তারপর তিনি বললেন, ‘আমিই মসুদ মিয়া। বাড়ি চলইন (চলেন)।’

বাড়ির উঠানে বসে কথা হয় মসুদ মিয়ার সঙ্গে। উঠানের পশ্চিম দিকে একটি আধা পাকা ঘর—এখনো রং করা হয়নি। পূর্বে ভাঙাচোরা কাঁচা আরেকটি ঘর। মসুদ মিয়া জানালেন, তাঁর তিন ছেলে ও দুই মেয়ে। মেয়ে দুজনকে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেদের মধ্যে মুহিবুরই বড়। পরিবারের সব আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রস্থল ছিল তিনি। কথা বলতে গিয়ে বারবার কেঁদে ফেলছিলেন মসুদ মিয়া, গুছিয়ে তেমন কিছু বলতে পারছিলেন না। একপর্যায়ে ঘরের ভেতর থেকে তাঁর আরেক ছেলে হাবিবকে ডেকে নিয়ে আসেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

যেভাবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলো

স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ২০২৩ সালের শেষের দিকে পড়াশোনার ভিসা নিয়ে রাশিয়ায় যান মুহিবুর। তখন তাঁর সঙ্গে পরিবারের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। ২০২৫ সালের নভেম্বরে দেশে ফিরে প্রায় এক মাস অবস্থান করেন। বিয়ে করে ডিসেম্বরে আবার রাশিয়ায় চলে যান। পরে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। এরপর কয়েক দিন পরিবারের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল, কিন্তু হঠাৎ করেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

রুশ ভাষায় মুহিবুরের নিয়োগপত্রের একটি কপি দেখালেন মুহিবুরের ছোট ভাই হাবিব। তিনি জানান, রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগদানের আগে পরিবারের কাউকে জানাননি ভাই। পরে জানিয়েছেন। চাইলে তখন সেনাবাহিনী থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ নেই—এ কথাও বলেছিলেন। তাঁকে রান্নার কাজের কথা বলে নেওয়া হয়, কিন্তু পরে যুদ্ধের মাঠে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি পরিবারের সবার সঙ্গে মুহিবুরের সর্বশেষ কথা হয়। পরে মুহিবুরের অবস্থান জানতে ঢাকায় রাশিয়ার দূতাবাসে যোগাযোগ করা হয়েছে। তারা এমন কোনো তথ্য নেই বলে জানিয়েছিল।

মৃত্যুসংবাদ ও পরিবারের করুণ অবস্থা

মো. হাবিব প্রথম আলোকে বলেন, ১৭ এপ্রিল রাশিয়া থেকে এক ব্যক্তি ফোন করে মুহিবুরের সহকর্মীর বরাতে জানান, কিয়েভে ড্রোন হামলায় মুহিবুর মারা গেছেন। পরদিন ১৮ এপ্রিলও পরিবারের লোকজন ওই ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেন। এর পর থেকে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাঁদের ধারণা, লোকটি সম্ভবত অফলাইনে চলে গেছেন। একই হামলায় মুহিবুরের আরেক সহকর্মী আহত হয়েছেন বলেও ওই ব্যক্তি জানান।

বাবা মসুদ মিয়া বলেন, পাকা ঘরটি আত্মীয়স্বজন বানিয়ে দিয়েছেন। ছেলে দেশে আসার পর শুধু প্লাস্টার করেন। নিজেদের কোনো জমিজমা নেই। পাঁচ লাখ টাকার মতো ঋণ আছে। তিনি বলেন, ‘আমার কর্ম (কাজ) করার আর কেউ নাইরে বা। আমরারে বেফানা (অসহায়) করি ফালাইয়া গেছইন (ফেলে গেছেন)। আমরার আর্থিক অবস্থা অইল দিন আনি দিন খাই।’

মা সুফিয়া বেগম কথা বলতে পারছিলেন না, শুধুই কাঁদছিলেন। তিনি বলেন, ‘চাকরি-মজুরি করি ছেলেটারে পড়াইছি। জাগা-জমি নাই। তারে লইয়াই সব আশা-ভরসা আছিল (ছিল)। আমি চাই, তার লাশটা দেশও আনতাম। আমার বাইচ্চারে চোখের সামনে রাখতাম।’

বাড়িতে অবস্থানকালে প্রতিবেশী আব্দুর রউফ এসে আরেকটি চেয়ারে বসেন। সকালের বিষণ্নতা তখনো প্রকৃতিতে। একসময় নিজ থেকেই তিনি (আবদুর রউফ) বললেন, ‘ছেলেটা খুব ভালো। খুব কষ্ট করি লেখাপড়া করছে। মৃত্যুর খবরে শুধু তার পরিবার নয়, আশপাশের সবাই ভেঙে পড়েছে।’

লাশ ফেরত আনার চেষ্টা

রাশিয়া থেকে লাশ আনতে গত মঙ্গলবার মুহিবুরের ছোট ভাই মো. হাবিব মৌলভীবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে আবেদন করেন। আবেদনপত্রে ভাইয়ের লাশ দেশে আনার ব্যবস্থা করা এবং ক্ষতিপূরণ আদায়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। মঙ্গলবার রাশিয়ার দূতাবাসে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হয়। তবে দূতাবাস থেকে জানানো হয়েছে, তারা এমন কারও মৃত্যুসংবাদ পায়নি, পেলে জানাবে।

ইউএনও মো. রাজিব হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা অফিশিয়ালি এখনো কিছু জানি না। তাঁর পরিবারের বরাতে মৃত্যুর বিষয়টি জানা গেছে। আমরা প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠাচ্ছি। মারা গেলে লাশ ফিরিয়ে আনা ও সর্বশেষ পরিস্থিতি কী, সেটার ব্যাপারে জানা যাবে।’