যুদ্ধের মধ্যে ইরানে অবস্থানকালে আতঙ্কের মধ্যে সময় কাটিয়েছেন দেশে ফিরে আসা কর্মী মো. আব্দুল্লাহ। আজ বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কর্মসংস্থানের মূল অঞ্চল হলো মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় দেশগুলো। গত বছর বিভিন্ন দেশে যাওয়া কর্মীদের মধ্যে ৮২ শতাংশ গেছে এ অঞ্চলে। প্রবাসী আয়ের ৪৬ শতাংশ এসেছে এসব দেশ থেকে। এখন চলমান যুদ্ধের কারণে এ অঞ্চলে কর্মসংস্থান নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। নতুন কর্মী পাঠানো কমছে। কেউ কেউ ফিরে আসছেন। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে কর্মীদের ফিরে আসা বাড়তে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে তথ্য
‘ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ: বাংলাদেশি অভিবাসীদের ওপর প্রভাব এবং করণীয়’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য দেওয়া হয়েছে। জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে আজ বুধবার এর আয়োজন করে অভিবাসন খাতের বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু)। এতে বলা হয়, চলমান যুদ্ধের প্রভাবে নিরাপত্তাহীনতা, সুরক্ষা ঝুঁকি ও মানবিক উদ্বেগের সম্মুখীন হচ্ছেন মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসীরা।
লিখিত বক্তব্যে রামরু বলেছে, উপসাগরীয় অঞ্চল ও মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৫০ লাখ প্রবাসী আছেন। যুদ্ধের কারণে এ পর্যন্ত অন্তত ৯ জন শ্রমিক মারা গেছেন। ইরান থেকে ২০০ কর্মীকে উদ্ধার করে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবারের মার্চে বিদেশ যেতে কর্মসংস্থান ছাড়পত্র কমেছে ৫০ শতাংশ। তার মানে কর্মী যাওয়া কমছে। নতুন শ্রমবাজার তৈরি করতে হবে এবং চাহিদামতো দক্ষ কর্মী গড়ে তুলতে হবে।
রামরুর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারের বক্তব্য
রামরুর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, করোনা মহামারি সময়ের মতো ফিরে আসা প্রবাসীদের পুনর্বাসনে উদ্যোগ নিতে হবে। যুদ্ধের মধ্যে যাঁরা আটকা পড়েছেন, তাঁদের নিয়মিত সহায়তা করতে হবে। নিরাপত্তা না থাকায় অনেক বিনিয়োগ মধ্যপ্রাচ্য থেকে তুরস্কে চলে যাচ্ছে। কর্মসংস্থান কমায় অবৈধ অভিবাসন বেড়ে যেতে পারে। এ যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে হবে। নতুন বাজার খুঁজতে হবে। এর জন্য সামগ্রিক কাঠামো বদলাতে হবে। নাগরিক সমাজকে নিয়ে আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি করে এখন কাজ করতে পারে সরকার।
ইরান থেকে ফেরার অভিজ্ঞতা
যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের প্রবাসীদের কেউ কেউ বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করেন। জীবন বাঁচাতে দেশে ফিরে আসতে চান তাঁরা। তাঁদের উদ্ধার করে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মাধ্যমে দেশে ফেরানো হয়। ইরান থেকে ফ্লাইট বন্ধ থাকায় সড়কপথে আজারবাইজানে এনে ফ্লাইটে দেশে ফেরানো হয়। গত ২১ মার্চ ফিরে আসেন ১৮৬ জন। এরপর ১১ এপ্রিল আরও ১৪ জনকে আনা হয়। ইরান থেকে ফিরে আসা কুমিল্লার তিনজন কর্মী নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা বলেন সংবাদ সম্মেলনে। পুনর্বাসনে সরকারের সহায়তা চান তাঁরা।
ইরানের একটি দ্বীপে ছিলেন কুমিল্লার মো. আব্দুল্লাহ। দুই ভাই মিলে ঋণ করে গত বছরের নভেম্বরে দেশটিতে যান তাঁরা। ফিরে এসে এখন অসহায় জীবন যাপন করছেন। আব্দুল্লাহ বলেন, যুদ্ধ বাড়তে থাকলে মিসাইলের (ক্ষেপণাস্ত্র) শব্দে আতঙ্ক তৈরি হয়। রাতে ঘুমানো যায় না। বাঁচতে না–ও পারেন, তাই রাতে কালেমা পড়ে ঘুমাতেন। দেশে ফিরিয়ে আনায় সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, এখন সরকার সহায়তা না করলে ধারদেনা শোধ করা যাবে না।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে খারাপ অবস্থার মুখোমুখি হওয়া প্রবাসী কর্মীদের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছে অভিবাসন খাতের বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু)।
আব্দুল্লাহ আল কায়সার নামের আরেকজন বলেন, ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট ইরানে যান। প্রথম হামলার রাতে তেহরানে ছিলেন। হামলার পর মালিক ফোন দিয়ে জানান, যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। মুহূর্তে মুহূর্তে হামলা হচ্ছিল, ভয় পেয়ে যান। এর আগে ২০২৪ সালে ইসরায়েলের হামলার সময় তাঁকে তেহরানের বাইরে নিয়ে রাখেন নিয়োগকর্তা। এবার সেটা করেননি। তাই ভয়ে দেশ ফিরতে দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ঋণ করে পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে গেলেও ফিরেছেন অসহায় হয়ে।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যান মো. আবু কাওসার। তিনি বলেন, গাড়ির কারখানায় কাজ করতেন। যুদ্ধ শুরুর পর কাজ বন্ধ হয়ে যায়। মালিক নিরাপদ স্থান চলে যান, যোগাযোগ বন্ধ রাখেন। চারদিকে মিসাইল পড়ছে, বিকট আওয়াজ, অন্ধকার চারপাশ। অসহায় হয়ে দূতাবাসে যোগাযোগ করেন। দেশে ফিরে এখন পরিবার নিয়ে অসহায় অবস্থায় আছেন।
কাজ কমছে মধ্যপ্রাচ্যে
রামরুর লিখিত বক্তব্য তুলে ধরেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাশেদ আলম ভূঁইয়া ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জালাল উদ্দিন শিকদার। এতে বলা হয়, ইরানে বাংলাদেশিরা কেউ হতাহত হননি, তবে যুদ্ধের ফলে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে হতাহতের ঘটনা নিরাপত্তাঝুঁকি এবং উদ্বেগ তৈরি করেছে। বৃহৎ পরিসরে প্রত্যাবাসন, যোগাযোগ এবং আইনি সুরক্ষার সক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়ে গেছে। ২০১১ সালে লিবিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হলে প্রায় ৪০ হাজার বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিককে প্রত্যাবাসন করা হয়েছিল।
রামরু বলছে, দক্ষিণ লেবানন ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলার শিকার। লেবাননে কর্মরত বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মীরা চরম ঝুঁকির সম্মুখীন। সৌদি আরবের একটি অ্যাপভিত্তিক ডেলিভারি প্রতিষ্ঠানের গুদামের প্যাকেজিং কর্মী জানান, গুদামে ৪০০ জনের বেশি কর্মী ছিলেন। এখন আছেন মাত্র ৬৫ জন। বিক্রি কমায় বাকিদের সবাইকে ছাঁটাই করা হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের শ্রমিকেরা ব্যাপক মজুরি কর্তনের শিকার হচ্ছেন। যাঁদের নির্দিষ্ট চাকরি নেই, তাঁদের আয় নেই। জীবনযাত্রার খরচ বেড়েছে, বিমানভাড়া বেড়েছে।
রামরুর ভাষ্যমতে, সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ মেগা প্রকল্পগুলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে বলে আশা করা হয়েছিল। বিনিয়োগকারীদের আস্থার পতন, ব্যয় বৃদ্ধি বা সরাসরি অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণে এই প্রকল্পগুলো ব্যাহত হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমবে। আরব আমিরাতে বসবাসকারী ২০ লাখ বাংলাদেশির জীবন ও জীবিকা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সুপারিশ
বেশ কিছু সুপারিশ করেছে রামরু। এতে বলা হয়, যুদ্ধে যুক্ত দেশগুলোতে ২৪ ঘণ্টা বাংলা ভাষায় হটলাইন চালু করা। জরুরি ফেরত আসার নিয়ম ও প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে নির্দেশিকা তৈরি করে দূতাবাসে পাঠানো, রাজস্ব বাজেট থেকে জরুরি তহবিল বরাদ্দ করতে পারে সরকার। বাতিল হওয়া ফ্লাইট, আটকে পড়া অভিবাসী, ভিসার অবস্থা ও ফেরার তথ্য দ্রুত দেখা যায়—এমন একটি মনিটরিং ড্যাশবোর্ড তৈরি করা।



