চাঁদে ঘাঁটি গড়তে নাসার নতুন পরিকল্পনা, তিন প্রতিষ্ঠান পেল ৫৯ কোটি ডলার
চাঁদে ঘাঁটি গড়তে নাসার পরিকল্পনা, তিন প্রতিষ্ঠান পেল ৫৯ কোটি ডলার

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে নাসার সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘মুন বেজ’ উদ্যোগের হালনাগাদ পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। এ সময় ব্লু অরিজিন, লুনার আউটপোস্ট ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তৈরি নতুন চন্দ্রঘাঁটি প্রকল্পের মডেল প্রদর্শন করে নাসা। মাত্র কয়েক মাস আগে মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসা চাঁদে ঘাঁটি গড়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। তাদের প্রকল্পটি এখন বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে।

চাঁদে পণ্য পৌঁছে দেবে তিন প্রতিষ্ঠান

গত মঙ্গলবার নাসা ঘোষণা দিয়েছে, তারা অ্যাস্ট্রোবোটিক, ফায়ারফ্লাই অ্যারোস্পেস, ইনটুইটিভ মেশিনস নামের তিনটি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৫৯ কোটি ডলার দেবে। এই অর্থের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানগুলো চারটি মিশনের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য মালামাল চাঁদে পৌঁছে দেবে। এর মধ্যে অ্যাস্ট্রোবোটিকই একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যারা দুটি মিশনের দায়িত্ব পেয়েছে। নাসা আরও ইঙ্গিত দিয়েছে, মঙ্গলে অভিযান চালানো ‘প্রমিজ’ নামের রোভারকে ভবিষ্যতে চাঁদে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার কথাও ভাবা হচ্ছে।

স্থায়ী মানববসতি গড়ার পরিকল্পনা

এসব উদ্যোগ একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। এর লক্ষ্য হলো, রোবটচালিত যানবাহনের মাধ্যমে চাঁদে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা, যেন ভবিষ্যতে মানব মহাকাশচারীরা চাঁদে গেলে এই অবকাঠামোকে তাঁদের কাজ ও বসবাসের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। গতকাল মঙ্গলবার নাসাঘোষিত চুক্তিগুলো মূলত চাঁদে একটি স্থায়ী মানববসতি গড়ে তোলার বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ। সেখানে ভবিষ্যতে মহাকাশচারীরা বসবাস ও কাজ করবেন। নাসার চন্দ্রঘাঁটি কর্মসূচির নির্বাহী কর্মকর্তা কার্লোস গার্সিয়া গালান এই পরিকল্পনার প্রথম ধাপকে ‘ফেজ–১’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই ধাপ ২০২৮ সাল পর্যন্ত চলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ১ হাজার কোটি ডলার।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গত মাসে নাসা এই কর্মসূচির প্রথম ধাপের আওতায় আরও কয়েকটি চুক্তির ঘোষণা দিয়েছে। পরিকল্পনার দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে চাঁদে প্রথম চাপ-নিয়ন্ত্রিত আবাস নির্মাণ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা স্থাপনের পরিকল্পনা আছে। এর মাধ্যমে ২০৩০-এর দশকে ধাপে ধাপে চন্দ্রঘাঁটি সম্প্রসারণে নাসার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত নাসার আশা, মহাকাশচারীরা চাঁদে ‘আধা স্থায়ী’ বসতিতে বসবাস ও কাজ করতে পারবেন।

চীনকে টেক্কা দিতে নাসার কৌশল

মহাকাশ অভিযানের প্রতিযোগিতায় চীনকে টেক্কা দিতে নাসার বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত এক দশকে চীনের মহাকাশ কর্মসূচি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারা বারবার সতর্ক করে আসছেন, মহাকাশ প্রযুক্তিতে চীনের দ্রুত অগ্রযাত্রা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বকে ছাপিয়ে যেতে পারে।

বাধা মোকাবিলা

এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে নাসাকে ইতিমধ্যে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। জেফ বেজোসের মালিকানাধীন মহাকাশযান প্রস্তুতকারী সংস্থা ব্লু অরিজিন চলতি বছরের শেষ দিকে তাদের বিশাল রোবোটিক অবতরণযান ব্লু মুনের একটি প্রোটোটাইপ চাঁদের দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে পাঠানোর পরিকল্পনা করেছিল। চাঁদের দক্ষিণ প্রান্ত বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। কারণ, সেখানে প্রাকৃতিকভাবে জমাট হওয়া বরফের মজুত থাকার সম্ভাবনা আছে। এই বরফ থেকে ভবিষ্যতে রকেটের জ্বালানি বা পানযোগ্য পানি উৎপাদন করা যেতে পারে।

তবে মে মাসে ব্লু অরিজিন বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। তখন তাদের নিউ গ্লেন রকেটটি উৎক্ষেপণ স্থলেই হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়। এতে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যায়, যা পুনর্নির্মাণ করতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। ফলে ব্লু মুন মিশনের উৎক্ষেপণ কতটা পিছিয়ে যাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। মঙ্গলবার নাসার চন্দ্রঘাঁটি কর্মসূচির নির্বাহী কর্মকর্তা কার্লোস গার্সিয়া গালান ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রয়োজন হলে ব্লু মুন অবতরণযানকে অন্য কোনো উৎক্ষেপণযানে করে পাঠানো হতে পারে। তিনি বলেন, ব্লু অরিজিনের রকেট ও উৎক্ষেপণকেন্দ্রের কাজ যদি নাসার নির্ধারিত সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে সংস্থাটি ‘বিকল্প ব্যবস্থা’ বিবেচনা করছে। এদিকে নিউ গ্লেন দুর্ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজাকম্যান স্পষ্ট করে বলেছেন, কোনো বাধা বা সমস্যা দেখা দিলে নাসা তাদের বেসরকারি সহযোগীদের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করবে।

৩০০০ কোটি ডলারের প্রশ্ন

ব্লু অরিজিন নাসার একমাত্র অংশীদার নয়। তবে তাদের ব্লু মুন অবতরণযান বেশির ভাগ রোবোটিক মহাকাশযানের তুলনায় অনেক বড়। এটি দুটি সংস্করণে তৈরি হওয়ার কথা, যার একটি মহাকাশচারী বহনের উপযোগী হবে। অপর দিকে মহাকাশযান প্রস্তুতকারী আরেক প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স চাঁদে মহাকাশচারী পরিবহনের জন্য তাদের স্টারশিপ রকেট তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। অবশ্য, বিশাল এই যান এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হয়নি। চাঁদের পৃষ্ঠে মালামাল পৌঁছে দিতে নাসার হাতে আরও কয়েকটি বিকল্প আছে। টেক্সাসভিত্তিক ফায়ারফ্লাই অ্যারোস্পেস এখন পর্যন্ত একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যারা পুরোপুরি সফলভাবে একটি চন্দ্রাভিযান সম্পন্ন করেছে। তাদের ব্লু গোস্ট যানটি গত বছর চাঁদের বিষুবীয় অঞ্চলের কাছে সফলভাবে অবতরণ করেছিল। আর টেক্সাসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইনটুইটিভ মেশিনস দুবার চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি অবতরণযান পাঠাতে সক্ষম হলেও উভয় ক্ষেত্রেই যানগুলো অবতরণের পর কাত হয়ে পড়েছিল। নাসার হিসাব অনুযায়ী, চন্দ্রঘাঁটি নির্মাণে প্রায় ৩ হাজার কোটি ডলার ব্যয় হতে পারে।

এই চন্দ্রঘাঁটি নাসার আর্টেমিস কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখন পর্যন্ত এ কর্মসূচির পেছনে প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলার খরচ হয়েছে। কর্মসূচির আওতায় ইতিমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে একটি মনুষ্যবিহীন অভিযান এবং এপ্রিল মাসে চাঁদের চারপাশে ঐতিহাসিক মনুষ্যবাহী অভিযান সম্পন্ন হয়েছে। পাঁচ দশকের বেশি সময় পর নাসা এখন আবার মানুষকে চাঁদের মাটিতে অবতরণ করানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। দীর্ঘ মেয়াদে সেখানে একটি স্থায়ী বসতি গড়ে তোলাও তাদের লক্ষ্য।