বি৬১২ ফাউন্ডেশন নামে ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান গ্রহাণুর আঘাত থেকে পৃথিবীকে রক্ষার জন্য গ্র্যাভিটি ট্রাক্টর নামে একটি উদ্ভাবনী কৌশল প্রস্তাব করেছে। ২০০২ সালে নাসার সাবেক নভোচারী এড লু এবং রাস্টি শোয়েকার্টের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থায় বর্তমানে প্রায় পঞ্চাশজন বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও সাবেক নভোচারী সদস্য হিসেবে আছেন। তাদের মূল লক্ষ্য হলো গ্রহাণু বা ধূমকেতুর মতো মহাজাগতিক বস্তুর আঘাত থেকে মানবজাতিকে রক্ষা করার কার্যকর কৌশল খোঁজা।
গ্র্যাভিটি ট্রাক্টর: মহাকর্ষের অদৃশ্য টান
গ্র্যাভিটি ট্রাক্টর কৌশলে কোনো বিস্ফোরণ ছাড়াই মহাকর্ষীয় টানের মাধ্যমে গ্রহাণুর গতিপথ পরিবর্তন করা হয়। এতে একটি রকেটকে গ্রহাণুর কাছে স্থির ভাসমান অবস্থায় রাখা হয়, যাতে সরাসরি সংস্পর্শ না থাকলেও মহাকর্ষ বলের মাধ্যমে তারা পরস্পরকে টানে। রকেটের ইঞ্জিন চালু করে ক্রমাগত পাল্টা ধাক্কা সৃষ্টি করা হলে স্বল্প মেয়াদে রকেটের গ্রহাণুর পৃষ্ঠমুখী পতন থমকে যায় এবং দীর্ঘ মেয়াদে গ্রহাণুটির গতিবেগে সামান্য পরিবর্তন আসে—প্রতি সেকেন্ডে কয়েক মিলিমিটার। তবে পৃথিবী থেকে হাজার হাজার মাইল দূরের কক্ষপথে ঠেলে দিতে এটুকুই যথেষ্ট।
কৌশলটির সফলতার জন্য রকেটের ইঞ্জিন থেকে নির্গত গ্যাস যেন সরাসরি গ্রহাণুর গায়ে না লাগে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বিজ্ঞানীরা মহাকাশযানের থ্রাস্টারগুলো কিছুটা বাঁকানোর পরামর্শ দিয়েছেন, যা ইঞ্জিনের কার্যকারিতা কিছুটা কমালেও গ্রহাণুর ওপর মহাকর্ষীয় টানের প্রভাব বজায় রাখে।
সময় ও আকারের প্রভাব
গ্র্যাভিটি ট্রাক্টর নিরেট পাথর বা পাথরের স্তূপ—উভয় ধরনের গ্রহাণুকেই টেনে সরাতে সক্ষম। তবে এতে যথেষ্ট সময়ের প্রয়োজন। ১০ বা ২০ বছর হাতে থাকলে ছোট বা মাঝারি আকারের গ্রহাণুর বিরুদ্ধে সফলতার হার প্রায় শতভাগ। কিন্তু শেষ মুহূর্তে কৌশলটি প্রায় অচল। উদাহরণস্বরূপ, ৯৯৯৪২ অ্যাপোফিসের মতো বস্তুকে নির্দিষ্ট কী-হোল থেকে দূরে রাখতে দুই-এক বছরই যথেষ্ট।
বিশাল আকারের গ্রহাণু বা যাদের সঙ্গে পৃথিবীর সরাসরি সংঘর্ষের নিশ্চিত সম্ভাবনা থাকে, তাদের জন্য এনহ্যান্সড গ্র্যাভিটি ট্রাক্টর নামে একটি উন্নত সংস্করণ প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে রোবোটিক আর্ম ব্যবহার করে টার্গেট গ্রহাণুর বুক থেকে পাথরখণ্ড সংগ্রহ করে নভোযানের ভর বাড়িয়ে নেওয়া হয়। মাত্র কয়েক টন ওজনের একটি পাথরের বাড়তি উপস্থিতিতে গ্রহাণুকে আগের চেয়ে ৫০ গুণ বা তারও বেশি শক্তিতে টানা সম্ভব হয়, যা মিশনের প্রয়োজনীয় সময়কাল নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনে।
নাসার অ্যাস্টেরয়েড রিডাইরেক্ট মিশন বাতিল
নাসা অ্যাস্টেরয়েড রিডাইরেক্ট মিশনের আওতায় গ্র্যাভিটি ট্রাক্টর কৌশলটি হাতে-কলমে যাচাই করার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু ২০১৭ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন মিশনটি বাতিল করে দেয়। মূলত মিশনের উচ্চ ব্যয় এবং মার্কিনীদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক টানাপোড়েনই এর পেছনে দায়ী ছিল।
বর্তমানে অনেক বিজ্ঞানী একাধিক গ্র্যাভিটি ট্রাক্টরের যুগপৎ প্রয়োগ বা অন্যান্য পদ্ধতির সঙ্গে এর সমন্বয়ের কথা ভাবছেন। যেমন—প্রথমে বিস্ফোরণের ধাক্কায় গ্রহাণুকে বিপদ এলাকা থেকে সরিয়ে, অতঃপর মহাকর্ষ বলের টানে ধীরে ধীরে এমন কক্ষপথে আনা, যেন ভবিষ্যতে পুনরায় হুমকির সৃষ্টি না হয়।
ধূমকেতুর চ্যালেঞ্জ
গ্রহাণুর তুলনায় ধূমকেতুর মোকাবিলা করা অনেক বেশি কঠিন। ধূমকেতু মূলত পাথর, ধূলিকণা ও বরফের সমন্বয়ে গঠিত। সূর্যের কাছাকাছি এলে প্রচণ্ড উত্তাপে এদের পৃষ্ঠের নিচে জমে থাকা বরফ সরাসরি গ্যাসে রূপান্তরিত হয়ে তীব্র বেগে বেরিয়ে আসে, যা রকেট ইঞ্জিনের মতো ধাক্কা সৃষ্টি করে। ফলে এদের কক্ষপথ অনির্দেশ্য হয়ে পড়ে এবং আগাম ভবিষ্যদ্বাণী করা প্রায় অসম্ভব।
ধূমকেতুদের কক্ষপথের নতি (inclination) যেকোনো মানের হতে পারে এবং এরা সৌরজগতের যেকোনো দিক থেকে আবির্ভূত হতে পারে। স্বল্প পর্যায়কালের ধূমকেতু (যেমন জুপিটার ফ্যামিলি ও হ্যালি-টাইপ) ২০০ বছরের কম সময়ে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে, অন্যদিকে দীর্ঘ পর্যায়কালের ধূমকেতুর পর্যায়কাল ২০০ বছর থেকে কয়েক লাখ বছর পর্যন্ত হতে পারে। এদের অনিশ্চিত স্বভাব ও অবিশ্বাস্য গতিবেগ বিজ্ঞানীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
উদাহরণস্বরূপ, ধূমকেতু হেল-বপ পৃথিবীর পাশ দিয়ে যাওয়ার মাত্র বছর দুয়েক আগে আবিষ্কৃত হয়েছিল। প্রায় ২৫ মাইল ব্যাসের নিউক্লিয়াসবিশিষ্ট এই ধূমকেতু যদি সরাসরি পৃথিবীকে লক্ষ্য করে ধেয়ে আসত, তাহলে আমাদের কোনো প্রতিরোধের সুযোগ থাকত না। ডাইনোসরদের বিলুপ্তির জন্য দায়ী চিক্সুলুব ইমপ্যাক্টরের আঘাতকেও তখন এটির সামনে নগণ্য মনে হতো।
স্বস্তির বিষয় হলো, হাজার হাজার নিকট-পৃথিবী বস্তু (NEO) ও সম্ভাব্য বিপজ্জনক বস্তুর (PHO) ভিড়ে ধূমকেতুর পৃথিবীতে আছড়ে পড়ার সম্ভাবনা খুব বেশি নয়—সব মিলিয়ে হয়তো কয়েক শতাংশ। তবুও এদের অনিশ্চিত প্রকৃতি বিজ্ঞানীদের চিন্তিত রাখে।



