৫ হাজার ডিগ্রি তাপেও অক্ষত: স্পেসক্রাফটের লোগো টিকে থাকে কীভাবে?
সম্প্রতি আর্টেমিস ২ মিশনের চার নভোচারী চাঁদের কক্ষপথ ঘুরে পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন। ১০ দিনের মিশন শেষে ওরিয়ন স্পেসক্রাফটে চড়ে তাঁরা প্রশান্ত মহাসাগরে নিরাপদে অবতরণ করেছেন। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় স্পেসক্রাফটের বাইরের তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৫ হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ২ হাজার ৭৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই তাপমাত্রায় লোহাও গলে তরল হয়ে যায়। কিন্তু এই ভয়াবহ আগুনের ভেতর দিয়ে আসার পরও স্পেসক্রাফটের গায়ে আঁকা লোগো বা পতাকার কিছুই হয়নি। এটা কীভাবে সম্ভব? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই এই প্রশ্ন তুলেছেন, এমনকি কেউ কেউ এটাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি ছবি বা ধাপ্পাবাজি বলেও মনে করছেন। আসুন, জেনে নিই স্পেসক্রাফটের গায়ে স্টিকার টিকে থাকার বিজ্ঞান।
মহাকাশযানের তাপের রহস্য: অ্যারোডাইনামিক হিটিং
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢোকার পর স্পেসক্রাফটের বাইরের দিকের তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৫ হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইট। এই তাপমাত্রায় লোহাও গলে তরল হয়ে যায়। মহাকাশে কোনো বাতাস নেই, সেখানে সবকিছু ফাঁকা। কিন্তু পৃথিবীর চারপাশ ঘিরে আছে বায়ুমণ্ডলের এক বিশাল চাদর। মহাকাশযান যখন পৃথিবীতে ফিরে আসে, তখন তার গতি থাকে ভয়ংকর রকমের বেশি। আর্টেমিস মিশনের ওরিয়ন স্পেসক্রাফটের কথাই ধরুন। চাঁদ থেকে ফেরার সময় এর গতি থাকে ঘণ্টায় প্রায় ৪০ হাজার কিলোমিটার! এই প্রচণ্ড বেগে ছুটে এসে মহাকাশযানটি হঠাৎ করেই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ধাক্কা খায়। ফাঁকা মহাকাশ থেকে হঠাৎ করে ঘন বাতাসের স্তরে ঢোকা মোটেও সহজ কাজ নয়। অনেকটা প্রচণ্ড বেগে ছুটে গিয়ে ইটের দেয়ালে ধাক্কা খাওয়ার মতো ব্যাপার এটা।
অনেকেই মনে করেন, বাতাসের সঙ্গে ঘর্ষণের কারণেই মহাকাশযানে আগুন ধরে যায়। আপনি দুই হাত একসঙ্গে ঘষলে যেমন গরম হয়ে ওঠে, ব্যাপারটা অনেকটা সে রকমই ভাবেন অনেকে। কিন্তু মহাকাশযানের ক্ষেত্রে এটা আসল কারণ নয়। আসল কারণ হলো বাতাসের প্রচণ্ড চাপ। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় অ্যারোডাইনামিক হিটিং। মহাকাশযানটি যখন ঘণ্টায় ৪০ হাজার কিলোমিটার বেগে নিচে নামতে থাকে, তখন তার সামনের বাতাস সরে যাওয়ার সময় পায় না। মহাকাশযানটি ওই বাতাসকে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা দেয় এবং এক জায়গায় চেপে ধরে। একটা সাইকেলের পাম্পারের কথা ভাবুন। আপনি যখন পাম্পারের হাতলটা জোরে চাপেন, তখন ভেতরের বাতাস এক জায়গায় জমা হয়ে গরম হয়ে যায়। মহাকাশযানের সামনেও ঠিক একই ঘটনা ঘটে। তবে সেটা ঘটে লাখ লাখ গুণ বেশি শক্তিতে। বাতাস এতই চেপে যায় যে, তা সাধারণ গ্যাসে আর সীমাবদ্ধ থাকে না। সেটা তখন প্লাজমা বা অতি-উত্তপ্ত গ্যাসে পরিণত হয়। তখনই তৈরি হয় ওই ভয়ংকর আগুনের গোলা। এই তাপমাত্রা সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রার প্রায় অর্ধেক!
হিট শিল্ড: নিজেকে ধ্বংস করে মহাকাশযানকে বাঁচায়
এত ভয়ংকর তাপ থেকে নভোচারীদের বাঁচানোর জন্য মহাকাশযানের নিচে একটি বিশেষ শিল্ড ব্যবহার করা হয়। এর নাম হিট শিল্ড। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় অ্যাবলেটিভ হিট শিল্ড। এই শিল্ডের কাজ করার ধরন খুবই অদ্ভুত। এটি নিজেকে ধ্বংস করে মহাকাশযানকে বাঁচায়! ব্যাপারটি একটু বুঝিয়ে বলি। এই হিট শিল্ড তৈরি হয় বিশেষ ধরনের উপাদান দিয়ে। ওরিয়ন স্পেসক্রাফটে অ্যাভকোট নামে একটি বিশেষ উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে। এই উপাদানের বিশেষত্ব হলো, এটি প্রচণ্ড তাপ পেলে গলে যায় বা পুড়ে যায়। পুড়ে যাওয়ার সময় এটি গ্যাসে পরিণত হয়। এই গ্যাস তখন হিট শিল্ড থেকে আলাদা হয়ে উড়ে যায়। উড়ে যাওয়ার সময় এই গ্যাস নিজের সঙ্গে করে ওই ভয়ংকর তাপকেও নিয়ে যায়। ফলে তাপ আর মহাকাশযানের মূল কাঠামোতে ঢুকতে পারে না। হিট শিল্ড একটু একটু করে পুড়তে থাকে এবং ক্ষয় হতে থাকে। ফলে ভেতরের নভোচারীরা থাকেন সহনীয় তাপমাত্রা, একদম নিরাপদ।
লোগো ও পতাকা টিকে থাকার বিজ্ঞান
এখন প্রশ্ন হলো, মহাকাশযানের নিচের দিকটা তো হিট শিল্ড দিয়ে বাঁচানো গেল। কিন্তু এর পাশের দিক বা ওপরের দিকের কী হবে? সেখানেই তো লোগো এবং পতাকাগুলো আঁকা থাকে! এর উত্তর লুকিয়ে আছে মহাকাশযানের আকারের মধ্যে। একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, পৃথিবীতে ফিরে আসা মহাকাশযানগুলো, মানে ক্যাপসুলগুলো সামনের দিক থেকে সুচালো হয় না। এগুলো হয় ভোঁতা। অনেকটা উল্টো করে রাখা ছাতার মতো। এই ভোঁতা আকারের একটা দারুণ সুবিধা আছে। মহাকাশযান যখন প্রচণ্ড বেগে বাতাসকে ধাক্কা দেয়, তখন এই ভোঁতা আকারের কারণে সামনে একটা শকওয়েভ তৈরি হয়। এই শকওয়েভ অনেকটা অদৃশ্য বুদ্বুদের মতো কাজ করে। প্রচণ্ড গরম ওই প্লাজমা বা আগুনের গোলাটা মহাকাশযানের গায়ে সরাসরি না লেগে, ওই অদৃশ্য বুদ্বুদের গা ঘেঁষে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। বিজ্ঞানীরা একে বলেন বাউ শক। ফলে মহাকাশযানের ঠিক পেছনের অংশে বা পাশের দিকে একটা নিরাপদ জায়গা তৈরি হয়। সেখানে আগুনের ওই ভয়ংকর তাপ সরাসরি পৌঁছাতে পারে না।
এবার আসি আমাদের মূল প্রশ্নে। আর্টেমিস বা নাসার লোগো এবং মার্কিন পতাকাগুলো কেন অক্ষত থাকে? প্রথম কারণ হলো তাদের অবস্থান। এই লোগো বা পতাকাগুলো কখনো মহাকাশযানের নিচের দিকে বা হিট শিল্ডের ওপর আঁকা হয় না। এগুলো সাঁটানো হয় মহাকাশযানের ওপরের দিকে বা পাশের অংশে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ব্যাক শেল। আগেই বলেছি, মহাকাশযানের ভোঁতা আকারের কারণে গরম বাতাসটা নিচ থেকে দুই পাশ দিয়ে ছিটকে চলে যায়। ফলে মহাকাশযানের ওপরের বা পাশের অংশে তাপের সরাসরি কোনো আঘাত লাগে না। নিচের দিকের তাপমাত্রা যেখানে ৫ হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইট থাকে, সেখানে ওপরের অংশের তাপমাত্রা থাকে অনেক কম। ওপরের দিকের তাপমাত্রা বড়জোর কয়েক শ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত ওঠে। যদিও ওপরের অংশের তাপমাত্রা নিচের মতো ভয়ংকর নয়, তারপরও সেটা কিন্তু বেশ গরম। সাধারণ রং বা স্টিকার হলে তা অনেক আগেই গলে বা পুড়ে ছাই হয়ে যেত। তাহলে এই লোগোগুলো টিকে থাকে কীভাবে?
কারণ, এগুলো সাধারণ কোনো রং বা স্টিকার দিয়ে তৈরি হয় না। এগুলো তৈরিতে ব্যবহার করা হয় অত্যাধুনিক স্পেস-এজ প্রযুক্তি। মহাকাশযানের ওপরের অংশটি ঢাকা থাকে বিশেষ ধরনের তাপনিরোধক কম্বল বা টাইলস দিয়ে। আর্টেমিস মিশনে ওরিয়ন মহাকাশযানের গায়ে চকচকে রুপালি রঙের একটি আবরণ দেখা যায়। এটি আসলে অ্যালুমিনিয়াম মেশানো একধরনের বিশেষ টেপ ও কম্বলের স্তর। আর এই আবরণের ওপর যে লোগো বা পতাকা বসানো হয়, সেগুলোও তৈরি হয় বিশেষ সিলিকন বা ক্যাপটন নামে পলিমার দিয়ে। এগুলো প্রচণ্ড তাপ সহ্য করতে পারে। এদের গলনাঙ্ক অনেক বেশি। ফলে মহাকাশযান যখন আগুনের গোলার ভেতর দিয়ে নিচে নামে, তখনো এগুলো গলে যায় না বা রং হারায় না। অনেক সময় বিশেষ ধরনের তাপনিরোধক রং দিয়েও এই লোগোগুলো সরাসরি স্পেসক্রাফটের গায়ে আঁকা হয়। এই রংগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়, যেন এরা তাপ শুষে না নিয়ে বরং তা প্রতিফলিত করে দিতে পারে। সূত্র: নাসা ও অরবিটাল এক্সপ্লোরেশন ডটকম।



