মঙ্গল অভিযানে নতুন সম্ভাবনা: রাশিয়ার প্লাজমা ইঞ্জিনে ৩০ দিনে পৌঁছানোর স্বপ্ন
মঙ্গল গ্রহে অভিযানের স্বপ্ন পূরণের পথে বিজ্ঞানীদের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে মহাকাশযানের গতি বা প্রপালশন সিস্টেম। বর্তমানে ব্যবহৃত রাসায়নিক রকেটগুলো দ্রুত জ্বালানি পুড়িয়ে শক্তিশালী ধাক্কা তৈরি করতে পারলেও দীর্ঘ দূরত্বের ভ্রমণে এগুলো তেমন কার্যকর নয়। এই কারণেই পৃথিবী থেকে মঙ্গলে পৌঁছাতে যেকোনো যানের সাধারণত ৬ থেকে ৯ মাস সময় লাগে, যা অভিযানের ঝুঁকি ও ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।
রাশিয়ার প্লাজমা ইঞ্জিন: একটি যুগান্তকারী ঘোষণা
এ বছরের শুরুর দিকে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম নতুন ধরনের প্লাজমা প্রপালশন ইঞ্জিন তৈরির কাজ শুরুর ঘোষণা দিয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তাত্ত্বিকভাবে, এই ইঞ্জিন ব্যবহার করলে মহাকাশ ভ্রমণের সময় নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। গবেষকদের দাবি, এই প্রযুক্তি সফল হলে মঙ্গল গ্রহে পৌঁছাতে সময় লাগবে মাত্র ৩০ দিন, যা বর্তমান সময়ের তুলনায় প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ কম।
তবে মনে রাখা প্রয়োজন, ৩০ দিনের এই হিসাব একটি তাত্ত্বিক অনুমান মাত্র। গবেষকেরা জানিয়েছেন, প্লাজমা ইঞ্জিনটি বর্তমানে প্রোটোটাইপ বা প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং কেবল পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়েছে। মহাকাশে এর কোনো সফল উড্ডয়ন পরীক্ষা এখনো সম্পন্ন হয়নি, যা বাস্তবায়নের পথে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
প্লাজমা ইঞ্জিন কীভাবে কাজ করে?
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার মতে, প্লাজমা ইঞ্জিন একধরনের ইলেকট্রিক প্রপালশন সিস্টেম। গতানুগতিক রকেটের মতো জ্বালানি পোড়ানোর বদলে এই ইঞ্জিন বিদ্যুৎ ব্যবহার করে গ্যাসকে (সাধারণত জেনন) প্লাজমায় রূপান্তরিত করে। এরপর বৈদ্যুতিক ও চৌম্বকক্ষেত্রের মাধ্যমে এই প্লাজমাকে প্রচণ্ড গতিতে বাইরে বের করে দেওয়া হয়, যা মহাকাশযানকে সামনের দিকে ঠেলে দেয়।
এটি রাসায়নিক রকেটের তুলনায় কম শক্তি উৎপাদন করলেও বিরতিহীনভাবে দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে। এই নিরবচ্ছিন্ন ধাক্কার ফলে মহাকাশযান ধীরে ধীরে অত্যন্ত উচ্চ গতি অর্জন করতে পারে। এতে জ্বালানি খরচ রাসায়নিক রকেটের তুলনায় অনেক কম, যা দীর্ঘমেয়াদী অভিযানের জন্য সুবিধাজনক।
চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
প্লাজমা ইঞ্জিনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিদ্যুৎ শক্তি। সূর্য থেকে অনেক দূরে গভীর মহাকাশে বিশাল সৌর প্যানেল দিয়ে এই ইঞ্জিনের জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল বিদ্যুৎ উৎপাদন করা কঠিন। রুশ বিজ্ঞানীদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্লাজমা ত্বরণ বজায় রাখতে তাঁরা একটি ক্ষুদ্র পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎস ব্যবহার করবেন, যা এই সমস্যা সমাধানে সহায়ক হতে পারে।
মাত্র ৩০ দিনে মঙ্গল জয়ের স্বপ্ন রোমাঞ্চকর হলেও বিজ্ঞানীরা সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন। যেকোনো নতুন প্রপালশন প্রযুক্তি মিশনের জন্য উপযুক্ত হওয়ার আগে বছরের পর বছর মহাকাশভিত্তিক পরীক্ষার প্রয়োজন হয়, যা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া।
ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা
মহাকাশ বিশ্লেষকদের মতে, নতুন প্রপালশন প্রযুক্তি যদি সফল হয়, তবে মানুষের আগে সম্ভবত পণ্যবাহী মিশন বা পরীক্ষামূলক প্রোবে প্রথম প্লাজমা ইঞ্জিন প্রথম ব্যবহার করা হবে। মঙ্গলে যাত্রার সময় কমিয়ে আনা গেলে নভোচারীরা ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে রক্ষা পাবেন এবং অভিযানের নিরাপত্তা বাড়বে।
বর্তমানে এটি একটি পরীক্ষামূলক প্রযুক্তি হলেও, আন্তগ্রহ ভ্রমণের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে প্লাজমা এবং ইলেকট্রিক প্রপালশন সিস্টেম বড় ভূমিকা পালন করবে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এই উদ্ভাবন মহাকাশ অভিযানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে এবং মানবজাতিকে মঙ্গলের মতো দূরবর্তী গ্রহে পৌঁছাতে সাহায্য করবে।
