আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে হঠাৎ করেই বেজে উঠেছিল বিপৎসংকেত। স্টেশনের রুশ অংশের একটি মডিউলে ছিদ্র হওয়ার হার হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে পাঁচ নভোচারীকে স্পেসএক্সের ড্রাগন ক্যাপসুল ফ্রিডমে আশ্রয় নিতে বলা হয়। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর ছিল যে, যেকোনো মুহূর্তে মহাকাশ স্টেশন ছেড়ে পৃথিবীতে জরুরি অবতরণের জন্য নভোচারীদের স্পেসসুট পরে পুরোপুরি প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দিয়েছিল মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা।
ঘটনার বিবরণ
পরে মেরামত কাজ স্থগিত করা হলে নভোচারীরা আবার মূল স্টেশনে ফিরে আসেন। বর্তমানে সবাই নিরাপদে আছেন। কিন্তু কী ঘটেছিল আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনে? ৫ জুন, শুক্রবার বিকালের ঘটনা এটি। মহাকাশ স্টেশনের রুশ অংশ জভেজদা সার্ভিস মডিউলের দিকে যাওয়া প্রিক নামে একটি ট্রান্সফার টানেল ছিদ্র হয়। অবশ্য এমন লিক হওয়ার ঘটনা এবারই নতুন নয়। এর আগে গত ২ জুন থেকে এই ছিদ্র দিয়ে বাতাস বেরিয়ে যাওয়ার হার হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।
মেরামতের উদ্যোগ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রাশিয়ার দুই কসমোনট স্টেশন কমান্ডার সের্গেই কুদ-সাভারচকভ এবং ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার সের্গেই মিকায়েভ মেরামতের কাজ শুরু করেন। ঠিক সেই সময়েই অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো দুর্ঘটনা এড়াতে নাসার চার নভোচারী জেসিকা মেয়ার, জ্যাক হ্যাথাওয়ে, সোফি অ্যাডেনট, ক্রিস উইলিয়ামস এবং রাশিয়ান কসমোনট আন্দ্রে ফেদিয়ায়েভকে ড্রাগন ক্যাপসুলে আশ্রয় নিতে বলা হয়।
লিকের কারণ ও নাসার সতর্কতা
মহাকাশ স্টেশনের সঙ্গে যুক্ত থাকা এই ড্রাগন ক্যাপসুলটি মূলত একটি লাইফবোট মতো কাজ করে। নির্দেশ পেলেই এটি মূল স্টেশন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নভোচারীদের নিয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসার জন্য তৈরি থাকে। অন্যদিকে, মেরামত কাজে ব্যস্ত দুই রুশ কসমোনটের পালানোর পথ হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছিল আলাদাভাবে যুক্ত থাকা সয়ুজ এমএস-২৮ নভোযানটিকে।
বাতাস লিক করার ঘটনা মহাকাশ স্টেশনে নতুন কিছু নয়, কিন্তু এবার নাসার এত সতর্ক হওয়ার পেছনে একটি ভয়ংকর কারণ ছিল। সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের মতে, রুশ দুই কসমোনট লিক হওয়া জায়গাটিতে পৌঁছানোর জন্য একটি করাত ব্যবহার করে স্টেশনের ভেতরের একটি অংশ কাটার পরিকল্পনা করেছিলেন!
নাসার বিরোধিতা
নাসা এই পদ্ধতির তীব্র বিরোধিতা করে। মহাকাশের মতো জায়গায় একটি স্টেশনের ভেতর করাত ব্যবহারের ফলে স্টেশনের আরও বড় কোনো ক্ষতি হতে পারে বা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারত। তাই তারা তড়িঘড়ি করে নিজেদের নভোচারীদের ড্রাগন ক্যাপসুলে নিরাপদ আশ্রয় নেওয়ার নির্দেশ দেয়।
ছয় বছরের পুরোনো সমস্যা
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে এই ছিদ্রের সমস্যা প্রায় ছয় বছর ধরে চলছে। রুশ স্পেস এজেন্সি রসকসমস জানায়, গত মাসে একটি কার্গো শিপ স্টেশনে যুক্ত হওয়ার পর থেকেই এই নতুন ছিদ্রটি নজরে আসে। আগে টুকটাক তালি দিয়ে কাজ চালানো হলেও এবার তারা বড়সড় মেরামতের উদ্যোগ নিয়েছিল।
বিশেষজ্ঞের মতামত
২০১২ সালে স্টেশনের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সাবেক কানাডিয়ান নভোচারী ক্রিস হ্যাডফিল্ড বলেন, ‘স্টেশনে প্রতিদিন গড়ে আধ পাউন্ডের মতো বাতাসের চাপ কমে যায়, যা স্বাভাবিক। কিন্তু এটি যখন বেড়ে এক বা দুই পাউন্ডে পৌঁছায়, তখন ব্যবস্থা নিতেই হয়। মহাকাশযানে বেঁচে থাকার বাস্তব সত্য হলো, আপনাকে সব সময়ই এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। যেকোনো মুহূর্তে আপনাকে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটতে হতে পারে।’
পরিস্থিতি স্বাভাবিক
নাসার বিরোধিতার পর রসকসমস যখন তাদের কসমোনটদের মেরামত কাজ স্থগিত করার নির্দেশ দেয়, তখন পরিস্থিতি শান্ত হয়। নাসার মুখপাত্র বেথানি স্টিভেন্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) জানান, মেরামত কাজ বন্ধ হওয়ায় নভোচারীদের নিরাপদ আশ্রয়ের প্রোটোকল বাতিল করে আবার স্টেশনের স্বাভাবিক কাজে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাশিয়ান বার্তা সংস্থা তাস নিশ্চিত করেছে, বর্তমানে মহাকাশ স্টেশন ও এর বাসিন্দাদের নিরাপত্তার জন্য কোনো হুমকি নেই। ১৯৯৮ সাল থেকে মহাকাশে টিকে থাকা মানুষের তৈরি সবচেয়ে বড় এই গবেষণাগারটি আবারও তার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরেছে।



