মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের অবসানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আসন্ন চুক্তিকে ইসরায়েলের জন্য বড় ধরনের কৌশলগত বিপর্যয় হিসেবে দেখছেন দেশটির নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। সোমবার (১৫ জুন) পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ঘোষিত এই চুক্তির রূপরেখা ইসরায়েলের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা অঙ্গনে তীব্র উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি ওয়াশিংটনে ইসরায়েলের হ্রাসমান প্রভাব এবং প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ব্যর্থতাকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
ইসরায়েলের ওপর প্রভাব ও বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ
ইসরায়েলের সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ড্যানি সিট্রিনোভিচ এই চুক্তিকে ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্য রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিপর্যয় হিসেবে অভিহিত করেছেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চুক্তিটি ইরানের স্বার্থকে সুরক্ষিত করলেও ইসরায়েলের নিরাপত্তার মূল উদ্বেগগুলোকে উপেক্ষা করেছে। ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের (আইএনএসএস) বিশ্লেষক সিমা শাইন বলেন, 'ইরানকে সন্তুষ্ট করার প্রক্রিয়ায় পারমাণবিক ইস্যুর মতো ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।'
নেতানিয়াহুর ব্যর্থতা ও 'মিস্টার ইরান' ভাবমূর্তি
দীর্ঘদিন ধরে 'মিস্টার ইরান' হিসেবে পরিচিত প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর জন্য এই চুক্তিটি ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে গণ্য হচ্ছে। হামাস, হিজবুল্লাহ এবং ইরানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের মাধ্যমে অক্টোবরের নির্বাচনে সুবিধা পাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের এমন সিদ্ধান্তে এখন তিনি নিজ দেশেই তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন। চুক্তির আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গভির এটি প্রত্যাখ্যান করলেও, এটি মানতে দেশটি কার্যত বাধ্য হবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
ওয়াশিংটনে ইসরায়েলের প্রভাব হ্রাস
বিশ্লেষক মাইকেল হোরোভিৎজ এবং মাইকেল মিলশটেইন উভয়েই ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ইসরায়েলের প্রভাব ম্লান হওয়ার বিষয়টি চিহ্নিত করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের পরামর্শ বা আগাম সতর্কবার্তা ছাড়াই কার্যত তাদের হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা স্পষ্টভাবে ইসরায়েলের দুর্বল অবস্থানকে প্রমাণ করে। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যেও ইসরায়েলকে কার্যত উপেক্ষা করার সুর পাওয়া গেছে।
চুক্তির ভবিষ্যৎ ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ইরানের সঙ্গে এই চুক্তির ফলে তিন মাসের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের পর তেহরান আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে আবির্ভূত হবে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের ওপর ইসরায়েলের প্রভাব সীমিত হয়ে পড়ায়, ভবিষ্যতে গাজা বা লেবাননের ক্ষেত্রেও ইসরায়েলকে বাধ্য হয়েই যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে যুদ্ধবিরতি বা চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে বলে সামরিক বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।



