মধ্যপ্রাচ্যে নতুন নিরাপত্তা কাঠামো: পাকিস্তানের কূটনৈতিক সাফল্য ও বাস্তবতা
মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা কাঠামো: পাকিস্তানের কূটনৈতিক সাফল্য

দীর্ঘদিনের সংঘাত, নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক উত্তেজনার পর মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধে একটি সমঝোতা সই হয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এই ঘোষণা দিয়েছেন, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে এ অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে ইলেকট্রনিক মাধ্যমে স্বাক্ষরিত এই আনুষ্ঠানিক সমঝোতা দীর্ঘদিনের বিরোধের স্থলে কূটনীতিকে জায়গা করে দেওয়ার একটি বিরল সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এই সমঝোতা ঘিরে উচ্ছ্বাস ও আশাবাদ সতর্কতার সঙ্গে গ্রহণ করা জরুরি। যেকোনো শান্তি চুক্তির ঘোষণা ও বাস্তবায়নের মধ্যবর্তী সময়ে তা ভেস্তে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। ইতিহাস সাক্ষী, অনেক স্বার্থান্বেষী মহল প্ররোচনা, সামরিক উত্তেজনা বা রাজনৈতিক অন্তর্ঘাতের মাধ্যমে কূটনৈতিক উদ্যোগ নস্যাৎ করার চেষ্টা চালায়।

ইসরাইলের বিরোধিতা ও চুক্তির ভঙ্গুরতা

দখলদার ইসরাইল ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছে যে তারা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির বাধ্যবাধকতা মানবে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প লেবাননে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়ার পরও ইসরাইলের এই ঘোষণা বর্তমান পরিস্থিতির ভঙ্গুরতাকেই সামনে এনেছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আঞ্চলিক দেশগুলোর জন্য এটি উপলব্ধি করা জরুরি যে এই সমঝোতার গুরুত্ব কেবল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মধ্যপ্রাচ্য কয়েক দশক ধরে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নিরাপত্তা কাঠামোর অভাবে ভুগছে, যা বিরোধ নিরসন, অবিশ্বাস দূরীকরণ এবং সংকটকে সশস্ত্র সংঘাতের দিকে মোড় নেওয়া থেকে রোধ করতে পারে।

ক্ষণস্থায়ী বোঝাপড়া উত্তেজনা কমাতে পারে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং পারস্পরিক সহযোগিতার অভ্যাস। এ ক্ষেত্রে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের বৈরিতার সমাধানে পাকিস্তানের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পাকিস্তানের কূটনৈতিক কৌশল

সাধারণত যেকোনো মধ্যস্থতার সাফল্য নির্ভর করে মধ্যস্থতাকারীর গ্রহণযোগ্যতার ওপর। পাকিস্তান ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় দেশের সঙ্গেই ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে নিজেকে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ইরানের সঙ্গে ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের গঠনমূলক সম্পর্ক রয়েছে। তেহরান ও ওয়াশিংটন—উভয়ের আস্থা অর্জন করতে পারে এমন দেশ খুঁজে পাওয়া কঠিন। পাকিস্তান সেই কঠিন কাজটিই করে দেখিয়েছে।

অবশ্য কেবল গ্রহণযোগ্যতা থাকলেই এই সমঝোতা সম্ভব হতো না। পর্দার আড়ালে পাকিস্তান যে পরিশ্রম করেছে তা ছিল অত্যন্ত ক্লান্তিকর। কোনো বড় ধরনের নাটকীয় পদক্ষেপের চেয়ে ধারাবাহিক আলোচনা ও সূক্ষ্ম কূটনীতির মাধ্যমেই এই সাফল্য এসেছে। পাকিস্তান কেবল সৎ মধ্যস্থতাকারী হিসেবেই কাজ করেনি, বরং উভয় পক্ষের বাধাগুলো দূর করতেও সহায়তা করেছে। পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক পেশাদারত্ব ও আলোচনার দক্ষতা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় পক্ষই স্বীকার করেছে।

যদি এই চুক্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়—বিশেষ করে ইরানের জব্দকৃত সম্পদ মুক্তি পায় এবং নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়—তবে তা প্রমাণ করবে যে কেবল জনসমক্ষে দেওয়া বিবৃতির চেয়ে পর্দার আড়ালের ধৈর্যশীল ও দক্ষ কূটনৈতিক প্রচেষ্টাই সফল হয়।

পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ ভূমিকা

তবে পাকিস্তানের ভূমিকা এখানেই শেষ হওয়া উচিত নয়। এ অঞ্চলের শান্তি রক্ষায় বিদ্যমান বিভিন্ন আন্তঃরাষ্ট্রীয় বিরোধ নিষ্পত্তিতেও ইসলামাবাদ একটি বৃহত্তর রূপরেখা নিয়ে এগিয়ে আসতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য ও বৃহত্তর মুসলিম বিশ্ব বর্তমানে যে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি তা মোকাবিলায় কেবল সংকট ব্যবস্থাপনার চেয়ে আরও সমন্বিত পদ্ধতির প্রয়োজন। পাকিস্তান চাইলে সৌদি আরব, ইরান, তুরস্ক, মিসর ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে আলোচনা সহজতর করে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। এই কাঠামো কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট না হয়ে সংকট নিরসন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ দমনে একটি কার্যকর ব্যবস্থা হতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার জন্য শিক্ষা

ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের এই কূটনৈতিক সাফল্য দক্ষিণ এশিয়ার জন্যও একটি শিক্ষা। যদিও বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটি কিছুটা ভিন্নধর্মী মনে হতে পারে, তবুও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যে এই শান্তি চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন তাতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের অবদান স্বীকার করলে সেটি অস্বাভাবিক কিছু হতো না। এমন পদক্ষেপ ভারতের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করত না, বরং তা দেশটির রাষ্ট্রনায়কোচিত মনোভাব ও আত্মবিশ্বাসের পরিচয় দিত।

নরেন্দ্র মোদির মনে রাখা উচিত ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশী এবং তাদের ভবিষ্যৎ অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। গভীর মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও উত্তেজনা কমানোর সুযোগগুলো উপেক্ষা করা উচিত নয়। একটি গঠনমূলক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার স্বীকৃতি দুই দেশের বরফ গলাতে এবং শান্তি ও সহযোগিতার নতুন পথ প্রশস্ত করতে সহায়তা করতে পারে।

উপসংহার

পরিশেষে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের এই সমঝোতাকে কেবল একটি প্রক্রিয়ার সমাপ্তি নয় বরং একটি বৃহত্তর যাত্রার সূচনা হিসেবে দেখা উচিত। এই কূটনৈতিক সাফল্যকে দীর্ঘস্থায়ী শান্তিতে রূপান্তর করতে হলে ইসরাইলের মতো শান্তিভঙ্গকারীদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবিচল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করতে হবে। ইতিহাস পরিবর্তনের সুযোগ বারবার আসে না। বর্তমান মুহূর্তটি একটি সুযোগ এবং অঞ্চলটির উচিত এটি কাজে লাগানো।

লেখক: ইরানের সাবেক পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সাবেক রাষ্ট্রদূত। তিনি আফগানিস্তানের জন্য পাকিস্তানের সাবেক বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি ইসলামাবাদ পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (আইপিআরআই) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো হিসেবে কর্মরত।