ইরানে লাখ লাখ মানুষের ঢল: খামেনির জানাজায় ইতিহাসের রেকর্ড ভাঙার সম্ভাবনা
খামেনির জানাজায় লাখ লাখ মানুষের ঢল: রেকর্ড ভাঙার সম্ভাবনা

ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা ও শোক মিছিলে অংশ নিতে সোমবার রাজধানী তেহরানের রাজপথে লাখ লাখ মানুষের ঢল নেমেছে। কর্তৃপক্ষের ধারণা, জনসমাগমের এই সংখ্যা চার দশক আগে খামেনির পূর্বসূরির রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বিশাল জনসমুদ্রে তেহরান

কর্তৃপক্ষ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থিতির সঠিক সংখ্যা জানায়নি। তবে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির ছবিতে ইরানের রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়কজুড়ে বিশাল জনসমুদ্র দেখা গেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রথম দিন ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হন আলী খামেনি। তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় কমপ্লেক্সে দুই দিন তার মরদেহ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় রাখার পর আজ তা রাজধানীর রাস্তায় নিয়ে আসা হয়। এএফপির ছবিতে দেখা যায়, রাজপথ দিয়ে যাওয়ার সময় কফিনটি ফুলের পাপড়িতে ঢেকে দেওয়া হয়।

উত্তরসূরি ও ভবিষ্যৎ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে পাঁচ সপ্তাহের যুদ্ধের পর এই শেষ বিদায়কে নিজেদের ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি প্রদর্শনের সুযোগ হিসেবে দেখছে ইরান। তবে সবার নজর এখন খামেনির উত্তরসূরি ও তার ছেলে মোজতবা খামেনির দিকে, যিনি ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে এখনও জনসমক্ষে আসেননি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি এড়াতে সতর্কতা

১৯৮৯ সালে খামেনির পূর্বসূরি রুহুল্লাহ খোমেনির জানাজায় যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, এবার তার পুনরাবৃত্তি এড়াতে চাইছে কর্তৃপক্ষ। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনার তথ্যমতে, সে সময় প্রায় ১ কোটি মানুষের সমাগম হয়েছিল। হুড়োহুড়ির মধ্যে পড়ে তখন ১০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং ১০ হাজারেরও বেশি আহত হয়েছিলেন। শোক মিছিলে অংশ নেওয়া ৫৮ বছর বয়সী গোলামরেজা খানবাবাই বলেন, 'আমি যদি সেদিনের অনুষ্ঠানের সঙ্গে আজকের তুলনা করি, তবে বলব দুটির মধ্যে কোনও তফাত নেই। তবে এবারের জনতাকে আরও বেশি আবেগপ্রবণ ও উদ্দীপ্ত মনে হচ্ছে।'

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দেশব্যাপী শোক ও প্রতিশোধের প্রতীক

সাবেক সর্বোচ্চ নেতাকে স্মরণ করতে সোমবার পুরো দেশ স্তব্ধ হয়ে পড়ে এবং তেহরানের আকাশসীমা বন্ধ রাখা হয়। শোকগ্রস্ত জনতা ইরান ও লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর পতাকার পাশাপাশি প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে লাল পতাকা ওড়ান। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, পূর্ব তেহরানের ইমাম হোসেন স্কয়ারে জড়ো হয়ে অনেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কুশপুতুল দাহ করেন। স্থানীয় গণমাধ্যম জানায়, সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকেও এই মিছিলে অংশ নিতে দেখা গেছে। চরম গরমের মধ্যে শোকাকুল জনতার শরীর শীতল করতে ট্রাক থেকে পানি ছিটানো হয়। পাশাপাশি আয়োজকেরা ইরানের পতাকা এবং আলি ও মোজতবা খামেনির ছবি বিতরণ করেন। প্রায় ২০ কিলোমিটার (১২ মাইল) দীর্ঘ পথজুড়ে এই মিছিল অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

আগের দিনের শ্রদ্ধা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা

এর আগের দিন, নিহত খামেনি ও তার পরিবারের চার সদস্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হাজার হাজার মানুষ গ্র্যান্ড মোসাল্লায় সমবেত হন। হুড়োহুড়ি ও পদদলন ঠেকাতে সেখানে বিশাল কংক্রিটের দেয়াল দিয়ে কফিন ও সাধারণ জনগণকে আলাদা করে রাখা হয়েছিল। ১৯৮৯ সালে অতি-উত্তেজিত জনতা খোমেনির মরদেহ বহনকারী গাড়ি লক্ষ্য করে ঝাঁপিয়ে পড়লে কাফনের কাপড় ছিঁড়ে লাশ মাটিতে পড়ে গিয়েছিল। পরে হেলিকপ্টারে করে তার মরদেহ দাফনের জন্য নিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল কর্তৃপক্ষ। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে এবার সতর্ক অবস্থানে রয়েছে প্রশাসন।

আগামী দিনের কর্মসূচি

সোমবারের এই মিছিলের পর মঙ্গলবার ধর্মীয় কেন্দ্র কোম নগরীতে এবং আগামী বুধবার ইরাকের পবিত্র নগরী নাজাফ ও কারবালায় অনুরূপ শোক মিছিল অনুষ্ঠিত হবে। আগামী বৃহস্পতিবার উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ নগরীতে খামেনির নিজ জন্মভূমিতে দাফনের মধ্য দিয়ে এই আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে।

মোজতবার অনুপস্থিতি ও নতুন নেতৃত্ব

রবিবার খামেনির তিন ছেলেকে দীর্ঘ সময় পর জনসমক্ষে দেখা গেলেও মোজতবার অনুপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বাবার মৃত্যুর পরপরই মোজতবাকে দেশের সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করা হলেও তিনি এখনও আড়ালে রয়েছেন। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিমান হামলায় তিনি আহত হয়েছিলেন, তবে তার আঘাত কতটা গুরুতর তা স্পষ্ট নয়। অন্যদিকে, যুদ্ধের পুরো সময় আড়ালে থাকা ইরানের শক্তিশালী রেভল্যুশনারি গার্ডসের নতুন কমান্ডার আহমাদ ওয়াহিদি (যার পূর্বসূরি ২৮ ফেব্রুয়ারি নিহত হন) রবিবার দ্বিতীয়বারের মতো খোলা আকাশের নিচে জানাজায় অংশ নেন।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও প্রতিশোধের ডাক

গত জানুয়ারি মাসে ইরানে সরকারবিরোধী গণবিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যা মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে হাজার হাজার মানুষকে হত্যার মাধ্যমে দমন করা হয়েছিল। সেই ঘটনার পর বর্তমান সরকারের প্রতি জনগণের এই বিশাল সমর্থন ও গণজমায়েতকে প্রচার করতে উদগ্রীব হয়ে আছে প্রশাসন।

যুদ্ধবিরতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি প্রাথমিক চুক্তির পর ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ আপাতত স্থগিত রয়েছে। তবে ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয় পক্ষই সতর্ক করেছে যে তারা যেকোনো সময় আবারও সামরিক পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। আর খামেনির এই জানাজায় 'প্রতিশোধ' একটি প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিছিলে অংশ নেওয়া খামেনির সমর্থক খানবাবাই সেই সংঘাতের সুরেই বলেন, 'আমরা প্রতিশোধ চাই। এটা করতেই হবে। কারণ এখন যদি তা না করা হয়, তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।'