মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত
মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সূচনা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) দেশটি সিরিয়া থেকে নিজেদের সর্বশেষ সেনাসদস্যদের প্রত্যাহার সম্পন্ন করার মাধ্যমে প্রায় এক দশকের সামরিক উপস্থিতির ইতি টেনেছে। এই সিদ্ধান্তকে আঞ্চলিক শান্তি প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
কাসরাক ঘাঁটি থেকে মার্কিন সেনাদের চূড়ান্ত প্রস্থান
সিরিয়ার হাসাকাহ অঞ্চলে অবস্থিত 'কাসরাক' সামরিক ঘাঁটি থেকে মার্কিন সেনাদের সরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে এই ঐতিহাসিক প্রত্যাহার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। মিডল ইস্ট আই-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিরীয় কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে যে মার্কিন সেনারা প্রস্থানের পরপরই সিরিয়ার সেনাবাহিনীর ৬০তম ডিভিশন 'কাসরাক' ঘাঁটিতে প্রবেশ করে। এই ঘাঁটিতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটি অবস্থিত ছিল, যা কৌশলগত দিক থেকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
২০১৫ সাল থেকে ইসলামিক স্টেট (আইএস) বিরোধী লড়াইয়ের নামে মার্কিন বাহিনী সিরিয়ায় অবস্থান করছিল। বিশ্লেষক চার্লস লিস্টার স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের সম্ভাব্য হামলা এড়াতে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মার্কিন সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম জর্ডান সীমান্ত দিয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এই ঘাঁটিটি সিরীয় ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ) এবং সরকারি বাহিনীর যৌথ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
সিরিয়ার সরকারি প্রতিক্রিয়া ও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা
সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে। সরকারি বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে যে এই পদক্ষেপের মাধ্যমে এসডিএফ-কে জাতীয় কাঠামোর সঙ্গে একীভূত করার প্রক্রিয়া প্রতিফলিত হয়েছে। এখন থেকে সিরিয়া রাষ্ট্র নিজেই তার ভূখণ্ডে সন্ত্রাসবাদ দমনের পূর্ণ দায়িত্ব পালন করবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে বাশার আল-আসাদকে পরাজিত করে সিরিয়ার ক্ষমতায় বসেন আহমেদ আল-শারা। এই নতুন সরকারকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দিচ্ছে, যা আঞ্চলিক রাজনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নির্দেশ করে। চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় এসডিএফ এবং দামেস্ক সরকারের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার ফলে কুর্দি যোদ্ধারা সিরীয় সরকারের অধীনে কাজ করতে সম্মত হয়। এই চুক্তিই মার্কিন সেনাদের জন্য সিরিয়া ত্যাগ করা তুলনামূলকভাবে সহজ করে তুলেছে।
আঞ্চলিক সম্পর্ক ও শান্তি প্রক্রিয়ার প্রভাব
সিরিয়ায় এসডিএফের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠতা দীর্ঘকাল ধরে ন্যাটোর মিত্র তুরস্কের সাথে ওয়াশিংটনের সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছিল। আঙ্কারা এসডিএফকে সন্ত্রাসী সংগঠন পিকেকে-র অংশ হিসেবে দেখে আসছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুরস্ক ও পিকেকে-র মধ্যে শান্তি আলোচনা এবং এসডিএফের সাথে সিরীয় সরকারের সমঝোতা এই অঞ্চলের উত্তপ্ত পরিস্থিতি অনেকটাই শান্ত করেছে।
বিশ্লেষকরা সিরিয়া থেকে সেনা প্রত্যাহারের এই সিদ্ধান্তকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের 'যুদ্ধ বন্ধের' নীতির অংশ হিসেবে দেখছেন। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ইরানের সাথে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি এবং লেবাননে ইসরায়েলের সাথে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এর আগে আল-তানফ এবং আল-শাদাদি ঘাঁটি থেকেও সেনা সরিয়ে নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, যা মার্কিন নীতির ধারাবাহিকতা নির্দেশ করে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতিতে এই পরিবর্তন নিম্নলিখিত দিকগুলোকে প্রভাবিত করতে পারে:
- সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর পুনর্গঠন প্রক্রিয়া
- আঞ্চলিক শক্তি ভারসাম্যের পুনর্বিন্যাস
- সন্ত্রাসবাদ বিরোধী অভিযানের নতুন কৌশলগত দিকনির্দেশনা
- আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন মাত্রা সংযোজন



