মধ্যপ্রাচ্যে তেল ও গ্যাসের প্রাচুর্যের পেছনে ভূতাত্ত্বিক রহস্য
পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর বিশাল তেল ও গ্যাসের সম্পদ একদিকে যেমন তাদের জন্য আশীর্বাদ, অন্যদিকে তেমনি বহু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করেছে। লাখ লাখ বছর ধরে চলা ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া এই অঞ্চলটিকে বৈশ্বিক জ্বালানি কেন্দ্রে পরিণত করেছে। এ কারণেই মধ্যপ্রাচ্যে বড় কোনো সংঘাত শুরু হলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট তৈরি হয়, যেমন বর্তমান ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে।
ভূতাত্ত্বিক অবস্থানের অনন্যতা
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল এমন একটি স্থানে অবস্থিত যেখানে দুইটি বিশাল টেকটোনিক প্লেট—দক্ষিণ-পূর্বের অ্যারাবিয়ান প্লেট এবং পূর্ব ও উত্তরের ইউরেশীয় প্লেট—মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত। এই সংঘর্ষ প্রায় ৩৫ মিলিয়ন বছর ধরে চলছে, যার ফলে তৈরি হয়েছে এক গতিশীল ভূ-প্রকৃতি। ভূ-গর্ভের তীব্র তাপ ও চাপে শিলাস্তরগুলো দুমড়ে-মুচড়ে গেছে এবং রূপান্তরিত হয়েছে।
উপসাগরের দুই তীরের ভূতাত্ত্বিক গঠন একেবারেই ভিন্ন। ইরানের দিকে ১,৮০০ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত জাগরোস পর্বতমালা, যা আল্পাইন-হিমালয় পর্বত ব্যবস্থার অংশ, গত ৬০ মিলিয়ন বছরে ইউরেশিয়ার সঙ্গে আফ্রিকা, আরব ও ভারতের সংঘর্ষের ফলে সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে, আরব উপকূলে প্লেট সংঘর্ষের প্রবল চাপে ভূ-গর্ভের শক্ত শিলাস্তর বেঁকে গিয়ে বিশাল গম্বুজাকৃতির কাঠামো তৈরি করেছে, যা শত শত বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত।
তেল ও গ্যাস গঠনের প্রক্রিয়া
ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেল সামুদ্রিক জীব যেমন জুওপ্ল্যাঙ্কটন ও ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের জৈব পদার্থ থেকে তৈরি হয়। এই উপাদানগুলো প্রথমে কাদামাটি সমৃদ্ধ চুনাপাথর ও অন্যান্য শিলার স্তরে ঘনীভূত হয় এবং পরে উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপের সংস্পর্শে আসে। যখন কোনো শিলায় অন্তত দুই শতাংশ জৈব পদার্থ থাকে, তখন সেটিকে তেল ও গ্যাস উৎপাদনের জন্য উচ্চমানের সোর্স রক হিসেবে ধরা হয়।
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল এ ধরনের শিলাস্তরে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। উদাহরণস্বরূপ, আরব উপকূলের হানিফা ও তুওয়াইক শিলাস্তর, যা জুরাসিক যুগে গঠিত হয়েছিল, এবং ইরানের খুজেস্তান শিলাস্তর, যা ক্রিটেসিয়াস যুগে তৈরি, এগুলোতে জৈব পদার্থের পরিমাণ ১% থেকে ১৩% পর্যন্ত, এমনকি কোথাও কোথাও আরও বেশি।
মজুতের গঠন ও বিশালতা
এ অঞ্চলের ভাঁজ পড়া ও ফাটলযুক্ত শিলাস্তর এবং গম্বুজ আকৃতির কাঠামো হাইড্রোকার্বন আটকে রাখা ও সংরক্ষণের জন্য খুবই উপযোগী। জাগরোস পর্বতমালার বাঁকগুলো স্যাটেলাইট ছবিতেও স্পষ্ট দেখা যায়, যেখানে কয়েকশ বিলিয়ন ব্যারেল তেল এবং কয়েক ট্রিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস মজুত রয়েছে।
পারস্য উপসাগরের তেল ও গ্যাসক্ষেত্রের মানচিত্রে উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে লম্বাটে কাঠামো দেখা যায়, যা এখানকার বিশাল ভূ-প্রকৃতির প্রতিফলন। আরব প্লেটের গম্বুজাকৃতির কাঠামোতে তৈরি হয়েছে সৌদি আরবের ঘাওয়ার তেলক্ষেত্র, বিশ্বের বৃহত্তম তেলক্ষেত্র, যেখান থেকে ৭০ বিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি তেল উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। একইভাবে, সাউথ পার্স-নর্থ ডোম গ্যাসক্ষেত্র থেকে অন্তত ৪৬ বিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা আছে, যা শক্তির দিক থেকে ২০০ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের সমান।
ইতিহাস ও তুলনামূলক বিশ্লেষণ
শেষ বরফযুগের শেষে পারস্য উপসাগর গঠনের সময় থেকেই হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতি সম্পর্কে মানুষ জানতে পারে। হাজার হাজার বছর আগে মানুষ বিটুমিন ব্যবহার করত, যা এক ধরনের ভারি পেট্রোলিয়াম। ১৯০৮ সালে পশ্চিম ইরানে আধুনিক যুগের প্রথম তেলের সন্ধান পাওয়া যায়, এবং ১৯৫০-৬০ এর দশকে তেল অনুসন্ধান বৃদ্ধি পেলে এটি স্পষ্ট হয় যে বিশ্বের অন্য কোথাও এত বিশাল সম্পদের মজুত নেই।
রাশিয়ার পশ্চিম সাইবেরিয়া বা যুক্তরাষ্ট্রের পারমিয়ান বেসিনের মতো অন্যান্য অঞ্চলেও তেল ও গ্যাস আবিষ্কার হয়েছে, কিন্তু সেগুলো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বিশাল মজুত বা উচ্চ উৎপাদন হারের সাথে পাল্লা দিতে পারে না। পৃথিবীর মাত্র ৩% ভূ-ভাগের নিচে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক তেল ও ৪০% গ্যাস মজুদ রয়েছে, যা এ অঞ্চলের অনন্যতাকে তুলে ধরে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার মতে, এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে উৎপাদন চলার পরেও এই অঞ্চলে আরও বিশাল তেলের ভাণ্ডার আবিষ্কৃত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। ২০১২ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যারাবিয়ান পেনিনসুলা ও জাগরোস পর্বতমালায় আগে আবিষ্কৃত তেল-গ্যাসের বাইরেও প্রায় ৮৬ বিলিয়ন ব্যারেল তেল ও ৯.৫ ট্রিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস থাকতে পারে।
এছাড়া, হরাইজন্টাল ড্রিলিং ও ফ্র্যাকচারিংয়ের মতো আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেলক্ষেত্রগুলোতে এ পদ্ধতিগুলো পরীক্ষা করা হচ্ছে, যদিও এর সফলতা নিয়ে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে, এসব প্রযুক্তি উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে, যা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি আধিপত্যকে আরও সুদৃঢ় করবে।



