সোশ্যাল মিডিয়া যুদ্ধে ইরানের চমক: মিম দিয়ে মার্কিনীদের মন জয়
সোশ্যাল মিডিয়া যুদ্ধে ইরানের চমক: মিম দিয়ে মন জয়

সোশ্যাল মিডিয়া যুদ্ধে ইরানের চমকপ্রদ সাফল্য

ইরান যদি ঠিক যত দ্রুত 'মিম' বানাতে পারে, তত দ্রুত ধ্বংসাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারত, তবে হয়তো মার্কিন সেনা কমান্ডকে এতক্ষণে সাদা পতাকা দেখাতে হতো। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের এক অদ্ভুত ও অপ্রত্যাশিত দিক হলো, রক্ষণশীল ধর্মীয় নেতৃত্বের দেশ হওয়া সত্ত্বেও সোশ্যাল মিডিয়া যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে অনেকটা পেছনে ফেলে দিয়েছে ইরান। ট্রাম্প প্রশাসনকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ও কটাক্ষ করে পশ্চিমা দর্শকদের মন জয় করছে ইরানের জেন-জি কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।

যোগাযোগ যুদ্ধে ইরানের আধিপত্য

জন্স হপকিন্স ইউনিভার্সিটির স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সহকারী অধ্যাপক নার্গেস বাজোঘলি সম্প্রতি এক ব্রিফিংয়ে বলেন, যুদ্ধ দুটি জায়গায় হয়। একটি যুদ্ধক্ষেত্র, আর অন্যটি যোগাযোগ যুদ্ধ। ইরান বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করতে পেরেছে। তিনি বলেছেন, ইরান জানে যে গত ৫০ বছর ধরে তাদের 'সন্ত্রাসী রাষ্ট্র' হিসেবে চিত্রায়িত করায় যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার মিডিয়ায় তাদের কোনও জায়গা নেই। তাই তারা সুকৌশলে সোশ্যাল মিডিয়ার কথোপকথন ও বয়ানকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।

সৃষ্টিশীল কন্টেন্টের বিস্তার

ইরানের এই সৃষ্টিশীলতার ছাপ দেখা যাচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকায় দেশটির দূতাবাসের সোশ্যাল মিডিয়া ফিড থেকে শুরু করে পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ গালিবাফের অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত। দক্ষিণ আফ্রিকায় ইরানি দূতাবাসের সাম্প্রতিক একটি পোস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ১৯৮০-এর দশকের রকস্টার সাজে দেখা গেছে। সেখানে ডিজায়ারলেসের বিখ্যাত 'ভয়েজ, ভয়েজ' গানের অনুকরণে 'ব্লকেড' গান গেয়ে কিবোর্ড বাজাচ্ছেন ট্রাম্প। মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভিডিওটি ৪৫ হাজারের বেশি লাইক পেয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা

অধ্যাপক বাজোঘলি আরও জানান, ইরানে তরুণ মিলেনিয়াল ও জেন-জি কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের একটি শক্তিশালী প্রজন্ম তৈরি হয়েছে। এই যুদ্ধ নিয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে বার্তা পাঠানোর জন্য তাদের পূর্ণ স্বাধীনতা ও সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, 'আমি গত ১৫ বছর ধরে এসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করছি, কিন্তু এমন কিছু কখনও দেখিনি। যুক্তরাষ্ট্রের সব রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ; ডানপন্থি এমএজিএ সমর্থক থেকে শুরু করে মধ্যপন্থি রিপাবলিকান, লিবারেল ও বামপন্থি সবাইকেই প্রতিদিন ইরানের ভাইরাল কন্টেন্ট শেয়ার করতে দেখছি।

সামরিক বাহিনীর কৌশল

ইরানের সামরিক বাহিনীও এখন এই তরুণ প্রজন্মের ওপর যোগাযোগের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছে। তারা অনলাইনের ভাষা ও দর্শকদের মনস্তত্ত্ব এতটাই নিখুঁতভাবে বুঝতে পেরেছে যে সব ঘরানার মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারছে। ২০২৪ সালের এক বৈঠকে ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বলেছিলেন, শত্রুকে পিছু হটাতে এবং হৃদয় ও মন জয় করতে মিসাইল, প্লেন ও ড্রোনের চেয়েও বেশি কার্যকর মিডিয়া। সব যুদ্ধই একটা মিডিয়া যুদ্ধ। যে পক্ষের মিডিয়ায় প্রভাব বেশি, তারাই লক্ষ্য অর্জন করবে।

এই কৌশলগত পদক্ষেপ ইরানকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি অনন্য অবস্থানে নিয়ে গেছে, যেখানে তারা শুধু সামরিক শক্তি নয়, বরং সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবও বিস্তার করতে সক্ষম হচ্ছে।