ইরানের ড্রোন প্রযুক্তি: কম খরচে তৈরি ভয়ংকর ড্রোন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলকে চাপে ফেলেছে
ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তুলনামূলক কম খরচে তৈরি ড্রোন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে ইরানের হামলার পর যুদ্ধবিরতি এলেও, ইরানের ড্রোন প্রযুক্তির শক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি এবং যুদ্ধবিরতির চাপের পেছনে ইরানের ড্রোন ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
৪০ বছরের গবেষণায় ইরানের ড্রোন সাফল্য
দ্য আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের প্রকাশিত 'এ শর্ট হিস্ট্রি অব ইরানিয়ান ড্রোন প্রোগ্রাম' জার্নাল অনুসারে, ইরান ৪০ বছরের চেষ্টায় অন্তত ১৫ ধরনের ড্রোন বানাতে সক্ষম হয়েছে। এসব ড্রোনের আছে নানা ভেরিয়েন্ট, সব মিলিয়ে প্রায় এক শ ধরনের ড্রোন তৈরি করেছে দেশটি। এর মধ্যে কিছু ড্রোন বেশ ভয়ংকর, যা মুহূর্তের মধ্যে মারাত্মক হামলা চালাতে সক্ষম।
শাহেদ-১২৯: দূরপাল্লার হামলাকারী
ইরান সাম্প্রতিক সংঘাতে যে ড্রোনগুলো বেশি ব্যবহার করেছে, তার মধ্যে শাহেদ-১২৯ অন্যতম। এই ড্রোন টানা ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত আকাশে থাকতে পারে এবং প্রায় ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সক্ষম। শাহেদ-১২৯ হামলা চালানোর পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্যও সংগ্রহ করতে পারে। এটি একসঙ্গে সর্বোচ্চ চারটি গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে পারে।
ড্রোনটি রিমোট কন্ট্রোল চালিত এবং নেটওয়ার্ক জ্যামিংয়ের মধ্যেও কাজ করতে পারে। এই যুদ্ধের আগেই সিরিয়া, ইয়েমেন ও ইরাকে মার্কিন স্থাপনায় ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এই ড্রোন ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দারা মনে করে, ইরান ভবিষ্যতের জন্য এটাকে আরও উন্নত করছে।
শাহেদ-১৩৬: আত্মঘাতী ড্রোনের নতুন মাত্রা
ইরানের তৈরি আরেকটি ভয়ংকর ড্রোন হলো শাহেদ-১৩৬, যা সাম্প্রতিক সংঘাতে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। দামে কম কিন্তু কার্যক্ষমতায় উচ্চমানের এই আত্মঘাতী ড্রোনটি ২০ থেকে ৫০ কেজি ওয়ারহেড বা বোমা বহন করে। এর গতি ঘণ্টায় ১৮৫ কিলোমিটার এবং আড়াই হাজার কিলোমিটার দূর পর্যন্ত আঘাত হানতে পারে।
এই ড্রোনে স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিস্টেম আছে, যা একে ভাড়াটে সন্ত্রাসীর মতো কাজ করতে সক্ষম করে। সুনির্দিষ্ট টার্গেট সেট করে দিলে সেখানেই গিয়ে হামলা চালায় শাহেদ-১৩৬। ড্রোনটিতে লোকেশনের ছবি সেট করে দেওয়া হয়, এরপর এটি নিজের ক্যামেরা দিয়ে ওই ইমেজ মেলাতে থাকে এবং আক্রমণ করে। বাড়তি সুবিধা হলো, নিচুতে ওড়ার কারণে এটি রাডার ফাঁকি দিতে পারে। সমরবিদেরা বলছেন, ইউক্রেন যুদ্ধে প্রথম এই ড্রোন ব্যবহার হয় এবং রাশিয়াও এটি ব্যবহার করে।
শাহেদ-২৩৮: জেট ইঞ্জিনের শক্তি
শাহেদ-২৩৮ হলো আরেকটি ভয়ংকর ড্রোন, যা শাহেদ-১৩৬-এর চেয়েও বেশি শক্তিশালী। ১৩৬-এ প্রপেলার ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে, আর ২৩৮-এ ব্যবহার করা হয়েছে জেট ইঞ্জিন। এতে করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে গতি বেড়ে গেছে তিন গুণ, অনেকটা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের গতির কাছাকাছি। ফলে এটা ঠেকাতে খরচও হয় বেশি।
এই ড্রোনের রাডার ফাঁকি দেওয়ার ক্ষমতাও বেশি এবং এটি তৈরিতে খরচ শাহেদ-১৩৬-এর চেয়ে কম। ড্রোনটি বানাতে ইরানকে সাহায্য করছে চীন, এর ইঞ্জিন চীন থেকে আনা। যদিও শাহেদ-১৩৬ এর মতো এটা অনেক দূরে আঘাত হানতে পারে না, তবে এর রেঞ্জ ইসরায়েলে আঘাত আনার জন্য যথেষ্ট। এটাও প্রথম ব্যবহার করা হয়েছে ইউক্রেনে।
কুদস মোহাজের-১০: বহুমুখী দূরপাল্লার ড্রোন
ইরানের ড্রোনশিল্প এগিয়ে যাওয়ার পেছনে কুদস মোহাজের-১০ ড্রোনের বড় ভূমিকা আছে। এটি ইরানের অন্যতম বহুমুখী দূরপাল্লার ড্রোন, যার কার্যক্ষমতার পরিধি প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার। ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত উড়তে পারে এই ড্রোন এবং ৩০০ কেজি পর্যন্ত বোমা ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম বহন করতে সক্ষম।
২০২৩ সালে এই ড্রোন প্রকাশ্যে আনে ইরান। ড্রোনটির বাহ্যিক গঠন মার্কিন সামরিক বাহিনীর এমকিউ-৯ রিপার ড্রোনের মতো এবং এটি ৭ হাজার মিটার উচ্চতায় উড়তে পারে।
হাদিদ-১১০: কৌশলগত হামলার ড্রোন
হাদিদ-১১০ ড্রোনটি দালাহু নামেও পরিচিত, এটি একটি আত্মঘাতী ড্রোন। আইআরজিসি ২০২৫ সালে এটি প্রকাশ্যে আনে এবং এটি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কৌশলগত হামলা চালানোর উদ্দেশ্যে তৈরি। ড্রোনটি উৎক্ষেপণের সময় রকেটের সাহায্য নেয় এবং জেট ইঞ্জিন থাকায় এর গতি ঘণ্টায় ৫১০ কিলোমিটার।
পাখার বিশেষ নকশার কারণে রাডার ফাঁকি দিতে পারে হাদিদ-১১০। যদিও ড্রোনটি বেশি দূর যেতে পারে না, মাত্র ৩৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত যেতে পারে, তবে উড়তে পারে ৩০ হাজার ফুট উচ্চতায়। হাদিদ-১১০ ড্রোনটি ৩০ কেজি বোমা বহন করে এবং এটি এক ঘণ্টা পর্যন্ত উড়তে সক্ষম।
নজরদারির জন্য ড্রোন: ইরানের কৌশলগত প্রয়োজন
ইরানের সব ড্রোন যে হামলার জন্য ব্যবহার হয় তা নয়। দেশটির ড্রোন কর্মসূচির একটা বড় কারণ হলো নজরদারি। ইরান একটি বিশাল দেশ, যা পাহাড়ি এলাকায় ভরা এবং ইসরায়েলের চেয়ে ৭৫ থেকে ৮০ গুণ বড়। বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা করলে তারা আমাদের চেয়ে ১১ থেকে ১২ গুণ বড়, এশিয়ার ষষ্ঠ বৃহৎ দেশ ইরান।
এত বড় এলাকা নজরদারি করার জন্য ড্রোন তাদের অপরিহার্য ছিল। ইরানের মোটামুটি চারপাশে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি আছে, তাই সার্বক্ষণিক নজরদারি ছাড়া কোনো উপায় নেই। ড্রোন তাদের নজরদারির অন্যতম শক্তি এবং এই নজরদারির মাধ্যমে বিভিন্ন সময় তারা শত্রুদের চিহ্নিত করেছে ও হামলা চালিয়েছে। পাকিস্তানের বেলুচিস্তান স্বাধীনতা আন্দোলনের অনেকে এমন ড্রোন নজরদারিতে ধরা পড়েছেন।
ইরানের ড্রোন প্রযুক্তির এই অগ্রগতি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে এবং ভবিষ্যত সংঘাতের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।



