ইরানের টিকে থাকার রহস্য: বিশ্বাস, আত্মত্যাগ ও রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর তেহরানের ইনকিলাব স্কয়ারে জড়ো হয়েছিলেন তাঁর অনুসারীরা। এই ঘটনা দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক চাপের জটিল প্রেক্ষাপটকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের আলোচনা উঠলেই সাধারণত ডিটারেন্স, সামরিক চাপ, ক্ষেপণাস্ত্র, পরমাণু ঝুঁকির মতো শব্দগুলো শোনা যায়। তবে শুধু এই পরিচিত শব্দাবলিতে পুরো ছবিটা বোঝা সম্ভব নয়।
যুদ্ধের বহুমাত্রিক রূপ: অস্ত্র নয়, গল্প ও বিশ্বাসের লড়াই
ইরান কীভাবে লড়ছে এবং তার চেয়েও বড় কথা কীভাবে টিকে থাকছে, তা বুঝতে হলে আমাদের একটু গভীরে প্রবেশ করতে হবে। ঢুকতে হবে শুধু যুদ্ধক্ষেত্র নয়, বিশ্বাসের জগতেও। কারণ, এই রাষ্ট্রটি কেবল একটি প্রশাসনিক কাঠামো নয়; এর ভিত তৈরি হয়েছে শিয়া ধর্মতত্ত্বের এক বিশেষ ধারণার ওপর—শহীদি আত্মত্যাগ এবং ‘পবিত্র প্রতিরোধ’-এর ভিত্তিতে।
যুদ্ধ শুধু অস্ত্র দিয়ে হয় না। যুদ্ধ হয় গল্প দিয়ে, বিশ্বাস দিয়ে; আর মানুষকে কীভাবে বোঝানো হচ্ছে সেটা দিয়েও। পবিত্র রমজান মাসে হামলায় খামেনি নিহত হওয়ার পর দেশজুড়ে যে দৃশ্য তৈরি হয়েছে, সেটা বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে টানা শোক প্রকাশের অনুষ্ঠান চলছে, বোমা পড়ছে, তবু সেই শোক থামছে না। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অনুগতদের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে বাসিজ বাহিনীর সদস্যরা, এখনো মনে করেন যে তাঁরা এক ‘ঐশ্বরিক’ শাসনব্যবস্থার জন্য লড়ছেন। এ কারণে তাঁরা প্রয়োজনে প্রাণ দিতেও প্রস্তুত রয়েছেন।
ভুল ধারণার ভাঙন: বাইরের চাপে শক্তির উন্মেষ
এখানে একটি ভুল ধারণা ভাঙা দরকার। অনেকেই ধারণা করেন, বাইরে থেকে যত বেশি চাপ দেওয়া হবে, ততই এই রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়বে। বাস্তবতা কিন্তু কোনো কোনো সময় উল্টো হতে পারে। বাইরের আঘাত কখনো কখনো এই ব্যবস্থার সেই পুরোনো শক্তিটাকেই আবার জাগিয়ে তোলে, যেটা এত দিন ধরে তাকে টিকিয়ে রেখেছে।
এই শক্তির বড় উৎস শিয়া ইতিহাসের এক গভীর স্মৃতি। আর সেটি হলো ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দের কারবালার যুদ্ধ। সেখানে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নাতি ইমাম হোসেন (রা.) অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শহীদ হন। এই ঘটনাটা শুধু ইতিহাস নয়—এটি একটি প্রতীকে পরিণত হয়েছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের লড়াই, কষ্টের মধ্যেও সত্যের পাশে থাকা, আর প্রয়োজনে আত্মত্যাগ—এই সবকিছুর প্রতীক এটি।
শহীদি ধারণার রাজনৈতিক প্রয়োগ
এই কারণেই ‘শহীদি’ ধারণা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের রাজনীতিতে এত গুরুত্বপূর্ণ। তারা নিজেদের তুলে ধরে এমন একটি ‘ন্যায়ের পক্ষে থাকা রাষ্ট্র’ হিসেবে, যে রাষ্ট্রটি সাম্রাজ্যবাদ, অপমান আর বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছে। এখন সমস্যাটা কোথায়? সমস্যাটা হলো—যে রাষ্ট্র আত্মত্যাগকে এত গুরুত্ব দেয়, তাকে আঘাত করলে সেই আঘাতটাই উল্টো তার শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
বাইরে থেকে যেটা ধ্বংস মনে হয়, ভেতরে সেটাকে বলা হয় ‘ত্যাগ’, ‘সহনশীলতা’, ‘বিশ্বাসের প্রমাণ’। এমনকি মৃত্যুও সেখানে একধরনের রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। এই মুহূর্তে ইরানের কৌশলও অনেকটাই এমন—সহ্য করে যাওয়া, সময় নিয়ে লড়াই করা, শত্রুকে ক্লান্ত করা। আর এই ভরসা রাখা যে শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন আর তার মিত্রদের ধৈর্য আগে ফুরাবে।
জাতীয়তাবোধ ও রাজনৈতিক সুবিধা
এখানে আরেকটি বিষয় কাজ করে। তা হলো জাতীয়তাবোধ। অনেক ইরানি আছেন, যাঁরা ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে পছন্দ করেন না। কিন্তু বিদেশি হামলা দেখলে তাঁরাও ক্ষুব্ধ হন। তখন বিষয়টা আর শুধু সরকার বনাম জনগণ থাকে না—বরং হয়ে যায় ‘দেশ বনাম বাইরের শক্তি’। আর এই জায়গাটাই রাষ্ট্র সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারে।
শান্তির সময় এই সরকারের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দুর্নীতি, দমন-পীড়ন, অর্থনৈতিক সমস্যা তখন সবার সামনে আসে। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হলে ছবিটা বদলে যায়। তখন তারা নিজেদের তুলে ধরে। তখন সরকার নিজেদের ‘দমনকারী’ হিসেবে নয়, ‘দেশরক্ষক’ হিসেবে উপস্থাপন করে।
টিকে থাকার যুক্তি: বিশ্বাসী মানুষ ও চলমান সংঘাত
এটা ঠিক, সবাই এই গল্পে বিশ্বাস করে না। ইরানের ভেতরে অসন্তোষ আছে, সমর্থনও কমছে। কিন্তু একটা রাজনৈতিক ধারণা টিকে থাকতে সবার বিশ্বাস দরকার হয় না। দরকার কিছু বিশ্বাসী মানুষ, কিছু প্রতিষ্ঠান, কিছু ভয়; আর একটা চলমান সংঘাত। এই কারণেই বর্তমান যুদ্ধটা শুধু সামরিক দিক থেকে নয়, নৈতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকেও বিপজ্জনক।
যদি যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েল মনে করে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করে তারা ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ভেঙে ফেলবে, তাহলে তারা হয়তো ভুল হিসাব করছে। ধর্মীয় দিকটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এই যুদ্ধ শুধু ধর্মের জন্য হচ্ছে, এমন নয়। কিন্তু ধর্ম এমন এক ভাষা দেয়, যার মাধ্যমে কষ্টকে রাজনৈতিক অর্থে রূপ দেওয়া যায়।
হোসেইন দাব্বাঘ নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি লন্ডন-এর দর্শনের সহকারী অধ্যাপক। আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ।



