আন্তর্জাতিক মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্রমাগত নিজের মিথ্যায় জড়িয়ে পড়ছেন, যা একটি পদ্ধতিগত শাসন কৌশলে রূপ নিয়েছে। চেক রিপাবলিকের সাবেক প্রেসিডেন্ট ভ্যাকলাভ হাভেল তার ‘দ্য পাওয়ার অব দ্য পাওয়ারলেস’ বইয়ে যে মিথ্যাভিত্তিক ব্যবস্থার কথা বলেছেন, তা আজ ট্রাম্পের ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।
মিথ্যার পদ্ধতিগত রূপান্তর
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তিনি ৩০ হাজারেরও বেশি মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর দাবি করেছিলেন, যা গড়ে দিনে ২০টির বেশি। শেষ বছরে এই সংখ্যা প্রায় ৪০-এ পৌঁছায়। এটি কোনো সাধারণ ভুল নয়, বরং একটি সংগঠিত ও নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া। ফ্যাক্ট-চেকাররা এমনকি ‘বটমলেস পিনোকিও’ শব্দটি তৈরি করেছেন, যা এমন দাবিকে বোঝায় যেগুলো বারবার পুনরাবৃত্তির ফলে ভুল বলে চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। দ্বিতীয় মেয়াদে এই প্রবণতা আরও বিস্তৃত হয়েছে, যার পরিণতি এখন বৈশ্বিক স্তরে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে প্রবেশ করেছে।
ভাষার বিকৃতি ও যুদ্ধের নামান্তর
ট্রাম্প সচেতনভাবে যুদ্ধকে ‘অপারেশন’, ‘সীমিত মিশন’ বা ‘অভিযান’ বলে অভিহিত করেন, যদিও হাজার হাজার সৈন্য মোতায়েন ও বিমানবাহী রণতরীর পুনর্বিন্যাস বাস্তবতায় যুদ্ধেরই ইঙ্গিত দেয়। তিনি গত জুনে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ হওয়ার দাবি করলেও কয়েক মাস পর একই কর্মসূচিকে সামরিক পদক্ষেপের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেন। এই দ্বৈততা মিথ্যার ধারাবাহিকতাকে তুলে ধরে, যেখানে সত্য একটি লেনদেনের উপকরণে পরিণত হয়েছে।
বাস্তবতা অস্বীকার ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি
ট্রাম্পের ‘ফেক নিউজ’ শব্দের নিরন্তর ব্যবহার এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সমর্থন শুধু গণমাধ্যমের ওপর আক্রমণ নয়, বরং সত্যের অস্তিত্বের ওপরই আঘাত। এর উদ্দেশ্য হলো বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে সত্য-মিথ্যার সীমারেখা ঝাপসা করা, যাতে মানুষ আর কোনো কিছু বিশ্বাস করতে না পারে। এক সমাবেশে তিনি দাবি করেন, ইরানের নেতৃত্ব তাকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে চায়, যা পরে নাটকীয়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন—এমন দাবি কল্পকাহিনীতেও গ্রহণযোগ্য হতো না।
বিশ্বের পরিবর্তিত প্রতিক্রিয়া
ট্রাম্পের এই আচরণ বিশ্ব রাজনীতিতে পরিবর্তন এনেছে। মিত্ররা যেমন ফ্রান্স ও জার্মানি দ্বিধাগ্রস্ত বা বিরোধিতা করছে, তেমনি যুক্তরাজ্যও সীমিত সমর্থন দিচ্ছে। ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকটের মতো, এখন ক্ষমতার বিশ্বাসযোগ্যতা হ্রাস পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রকে আর স্থিতিশীল নেতৃত্ব হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং এক অস্থির শক্তি ও প্রদর্শনী হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
অন্ধকার হাস্যরসের কেন্দ্রবিন্দু
ট্রাম্প কেবল একজন ব্যবসায়ী নন, তিনি একজন বিদূষক যিনি নিজের আকর্ষণে অতিরিক্ত বিশ্বাস করেন। তিনি বাস্তবতা বর্ণনা না করে মঞ্চস্থ করেন, যেখানে প্রভাব সৃষ্টিই মুখ্য। তার পদ্ধতি জর্জ অরওয়েলের বর্ণিত ‘যুদ্ধ শান্তি হয়ে যায়’ ধারণার চেয়েও এগিয়ে, কারণ তিনি পুনরাবৃত্তিকে সত্যের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। এই অন্ধকার হাস্যরস একটি পরাশক্তির হাল ধরেছে, যা সাধারণ হাস্যরস নয়, বরং একটি বিপজ্জনক রাজনৈতিক নাটক।
সর্বোপরি, ট্রাম্পের মিথ্যার রাজনীতি শুধু ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য নয়, এটি একটি পদ্ধতিগত সংকট যা বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। হাভেলের বিশ্লেষণ আজও প্রাসঙ্গিক, যেখানে মিথ্যা শাসনের ভিত্তি হয়ে উঠেছে এবং এর পরিণতি বিশ্বব্যাপী অনুভূত হচ্ছে।



