মধ্যপ্থতা করতে গিয়ে চাপে পাকিস্তান, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে জটিলতা বাড়ছে
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে মধ্যস্থতায় চাপে পাকিস্তান

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে মধ্যস্থতায় পাকিস্তানের চাপ ও জটিলতা

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধে মধ্যস্থতা করতে গিয়ে পাকিস্তান বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। একদিকে ইসরায়েল ইরানের বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বোমা হামলা জোরদার করছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে স্থল সেনা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি আলোচনার আয়োজক হওয়ার পাকিস্তানের আশায় এখন ঘন কালো ছায়া পড়তে শুরু করেছে।

পাকিস্তানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও সুবিধা

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা একটি দেশ হিসেবে পাকিস্তান আলোচনার পথ তৈরিতে সক্রিয় কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের একটি বড় সুবিধা হলো—মধ্যপ্রাচ্যে তাদের কোনো বিশেষ ভূমিকা নেই। তাছাড়া পাকিস্তানে কোনো মার্কিন সামরিক ঘাঁটিও নেই, ফলে আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের মতো পাকিস্তানকে বাড়তি দায়িত্ব নিতে হবে না। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বলে মনে করা হয়, যা আলোচনায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। গত কয়েক বছরে তেহরানের সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্কেরও নাটকীয় উন্নতি ঘটেছে, এটি আরেকটি ইতিবাচক দিক।

পাকিস্তানের জরুরি স্বার্থ ও বাধা

পাকিস্তানের জন্য এই শান্তি প্রচেষ্টার পেছনে একটি জরুরি কারণ রয়েছে। গত বছর দেশটি সৌদি আরবের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার অর্থ হলো রিয়াদের পক্ষে দেশটিকে যুদ্ধে নামতে বাধ্য করা হতে পারে। ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত এবং ইরানের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিয়া মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশ হিসেবে পাকিস্তান যেকোনো মূল্যে এই পরিস্থিতি এড়াতে বদ্ধপরিকর। তবে বড় বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে ইসরায়েল। পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মতে, উভয় পক্ষ নীতিগতভাবে আলোচনায় বসার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও সংঘাত ক্রমে বিস্তৃত হচ্ছে এবং আস্থার অভাব প্রকট হয়ে উঠেছে। তেহরান ও ওয়াশিংটনের অবস্থান একে অপরের থেকে অনেক দূরে সরে গেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইসরায়েলের ভূমিকা ও হামলার প্রভাব

পাকিস্তানি কর্মকর্তারা মনে করেন, যেকোনো আলোচনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ইসরায়েলের ভূমিকা। শান্তি আলোচনায় প্রতিবন্ধক হিসেবে তাদের ভূমিকা স্পষ্ট। গত শুক্রবার ইসরায়েল ইরানের দুটি বৃহত্তম ইস্পাত কারখানা এবং বেসামরিক পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, এই হামলা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় হামলা না করার ঘোষণার পরিপন্থী। পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মতে, এ ধরনের বেসামরিক ও অরাজনৈতিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা যেকোনো আলোচনাকে নস্যাৎ করে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মালিহা লোধি বলেন, ইরানের মূল লক্ষ্য হলো যুদ্ধ শেষ করা এবং ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আর হামলা চালাবে না—এমন নিশ্চয়তা পাওয়া।

আস্থার সংকট ও ইরানের দাবি

লোধি আরও উল্লেখ করেন, ‘সবচেয়ে কঠিন বিষয় হলো, ট্রাম্পের কথায় বিশ্বাস রাখা। তিনি যুক্তিসংগত কোনো পক্ষ নন, তিনি সম্পূর্ণ খামখেয়ালি।’ ট্রাম্প দাবি করছেন, ইরান একটি চুক্তির জন্য মরিয়া। কিন্তু তেহরান বলছে, তিনি আসলে ‘নিজের সঙ্গেই নিজে দর-কষাকষি করছেন’। ইরান কেবল যুদ্ধবিরতিই নয়, বরং যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধের নিশ্চয়তা চায়। একটি সম্ভাবনা হতে পারে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ তেহরানের কাছেই রাখা। তবে এই ধারণাকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে ট্রাম্প নিজে এই প্রণালির যৌথ প্রশাসনের প্রস্তাব দিয়েছেন।

পাকিস্তানের তৎপরতা ও পরোক্ষ আলোচনার পরিকল্পনা

এখন পর্যন্ত পাকিস্তান উভয় পক্ষের মধ্যে প্রস্তাব আদান-প্রদান করেছে, যেখানে উভয় পক্ষই কট্টর অবস্থান নিয়েছে। শনিবার পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার হয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে ফোন করেছেন। পাশাপাশি যুদ্ধ অবসানের উপায় নিয়ে আলোচনার জন্য তুরস্ক, মিসর, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা রোববার ইসলামাবাদে বৈঠক শুরু করেছেন। ইসলামাবাদ ধারণা করছে, যেকোনো আলোচনা হবে পরোক্ষভাবে, যেখানে পাকিস্তানি কর্মকর্তারা আলাদা কক্ষে থাকা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে মধ্যস্থতা করবেন। তেহরান মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকে বসতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

পাকিস্তানের ভূমিকা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ

পাকিস্তান একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ এবং তাদের বিশাল সেনাবাহিনী আলোচনার ভেন্যুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। পাশাপাশি পাকিস্তানের বিমানবাহিনী ইরানি কর্মকর্তাদের যাতায়াতের জন্য এসকর্ট বা বিশেষ সুরক্ষা দিতে পারে। তবে ইরান বলছে, ওয়াশিংটন আবারও প্রতারণার চেষ্টা করছে। কারণ, গত এক বছরে আলোচনার মধ্যেই তারা দুবার ইরানে বোমা হামলা চালিয়েছে। এ অঞ্চলে মার্কিন সেনা মোতায়েন বৃদ্ধি ইঙ্গিত দিচ্ছে, শান্তি আলোচনা হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের মূল পরিকল্পনায় নেই। গত শনিবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের পথে থাকা ৭ হাজার পদাতিক সেনার পাশাপাশি পেন্টাগন আরও ১০ হাজার সেনা পাঠানোর কথা বিবেচনা করছে।

আস্থা তৈরির প্রচেষ্টা ও চ্যালেঞ্জ

আস্থা তৈরির লক্ষ্যে পাকিস্তান প্রস্তাব দিয়েছিল, যেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স—ইরান এ ধারণা গ্রহণ করেছে। তেহরান মধ্যস্থতাকারী স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারকে বিশ্বাস করে না। সামগ্রিকভাবে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টা জটিল ও চাপের মধ্যে রয়েছে, যেখানে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মিলে একটি কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।