মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের মাঝে বাংলাদেশে এলপিজি ট্যাংকারের আগমন
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাত ও উত্তেজনার পর প্রথমবারের মতো যুদ্ধকবলিত এলাকা থেকে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) নিয়ে একটি ট্যাংকার জাহাজ বাংলাদেশে পৌঁছেছে। 'এমটি বিডব্লিউইকে বোর্নহোম' নামের এই জাহাজটি গত শুক্রবার চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড এলাকায় পণ্য খালাস সম্পন্ন করেছে, যা জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি
শিপিং এজেন্ট ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্যানুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানে হামলা এবং পরবর্তী পাল্টা জবাবের পর মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় চরম উত্তেজনা তৈরি হওয়ার পর এই প্রথম কোনো এলপিজি পরিবাহী জাহাজ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে। জাহাজটি ওমানের দুকম বন্দর থেকে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ টন এলপিজি নিয়ে যাত্রা শুরু করে এবং পথিমধ্যে শ্রীলঙ্কায় আংশিক পণ্য খালাস করার পর সীতাকুণ্ডে অবশিষ্ট অংশ নামিয়ে দেয়।
এই এলপিজি আমদানি করেছে স্মার্ট গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিএম এনার্জি (বিডি) লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হলেও তারা সরবরাহকারীদের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ বজায় রেখে এই চালানটি বাংলাদেশে আনার ব্যবস্থা করতে পেরেছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি
ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণার পর পারস্য উপসাগরে নিরাপত্তা ঝুঁকি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে ইন্টারন্যাশনাল বার্গেনিং ফোরাম (আইবিএফ) এই পুরো এলাকাকে আনুষ্ঠানিকভাবে 'যুদ্ধাঞ্চল' হিসেবে ঘোষণা করেছে। ঝুঁকির মাত্রা বৃদ্ধির কারণে বিমা কোম্পানিগুলো যুদ্ধ প্রিমিয়াম বাড়িয়ে দিয়েছে, ফলে এই পথে পণ্য পরিবহনের খরচ আগের তুলনায় অনেকগুণ বেড়ে গেছে।
আটকে থাকা বড় জ্বালানি ট্যাংকার ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি বড় জ্বালানি ট্যাংকার এখনো পারস্য উপসাগরে আটকে আছে। 'এমটি লিব্রেথা' নামক জাহাজটি ৬২ হাজার টন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) নিয়ে কাতারের উপকূলে অবস্থান করছে, অন্যদিকে 'এমটি নরডিক পলুকস' জাহাজটি ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরের বহির্নোঙরে রয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি না পাওয়ায় জাহাজ দুটি এখনো বাংলাদেশে আসতে পারছে না।
এদিকে, আটকে থাকা এই জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ শুরু করেছে। গত ২৫ মার্চ ইরানকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়ে জাহাজগুলোর বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়েছে। ইরান ইতিবাচক সাড়া দিলেও কারিগরি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এখনো চলমান থাকায় জাহাজ দুটি এখনো তাদের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হতে পারেনি।
বাংলাদেশের জ্বালানি নির্ভরতা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ এবং এলএনজির ৬৫ শতাংশই এই অঞ্চল থেকে আমদানি করা হয়েছে। ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের পথ দ্রুত সুগম না হলে দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রথম এলপিজি ট্যাংকারের আগমন জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে, কিন্তু বড় ট্যাংকারগুলো মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও কারিগরি সমাধানের মাধ্যমে দ্রুত এই সংকট কাটিয়ে উঠা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি।



