সুয়েজের মতোই হরমুজ প্রণালি কি মার্কিন আধিপত্যের পতন ঘণ্টা বাজাবে?
সুয়েজের মতোই হরমুজ কি মার্কিন পতন ডেকে আনবে?

সুয়েজের মতোই হরমুজ প্রণালি কি মার্কিন আধিপত্যের পতন ঘণ্টা বাজাবে?

ইতিহাসের চাকা কি আবার ঘুরে আসছে? ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকট যেভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতনের সূচনা করেছিল, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালি কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সেই একই পরিণতি বয়ে আনবে? মিডল ইস্ট আইয়ের এক চাঞ্চল্যকর বিশ্লেষণে এমন প্রশ্ন উঠে এসেছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

সুয়েজ ১৯৫৬: ব্রিটিশ আধিপত্যের অবসানের সূচনা

১৯৫৬ সালে মিশরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করলে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইসরাইল যৌথ সামরিক অভিযান চালায়। যদিও যুদ্ধক্ষেত্রে তারা বিজয়ী হয়েছিল, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে তারা সম্পূর্ণরূপে পরাজিত হয়। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং বিশেষ করে আমেরিকার চাপে ব্রিটেনকে পিছু হটতে বাধ্য হয়। এই ঘটনাটি ব্রিটিশ পাউন্ডের মান ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেয় এবং বিশ্ব রাজনীতিতে লন্ডনের একক আধিপত্যের চিরতরে অবসান ঘটায়। এরপর থেকেই আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান নিয়ন্ত্রক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়।

বর্তমান প্রেক্ষাপট: হরমুজ প্রণালির কৌশলগত সংকট

বিশ্লেষকরা দাবি করছেন, প্রায় ৭০ বছর পর আজ আমেরিকা ঠিক একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। ইরানের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব ওয়াশিংটনকে গভীর সংকটে ফেলেছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। ইরান যদি এই পথ বন্ধ করে দেয় বা কোনোভাবে বিঘ্ন ঘটায়, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে ধ্বস নামবে, তা সামলানোর সক্ষমতা বর্তমান আমেরিকার নেই বললেই চলে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি প্রধান দুর্বলতা

বিশ্লেষণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি মূল দুর্বলতা চিহ্নিত করা হয়েছে:

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
  1. বিশাল ঋণের বোঝা: ১৯৫৬ সালে ব্রিটেনের ঋণের বোঝা যতটা ছিল, আজ আমেরিকার তার চেয়েও অনেক বেশি। প্রায় ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণের চাপে জর্জরিত ওয়াশিংটনের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
  2. সামরিক অতি-বিস্তার: ইউক্রেন থেকে শুরু করে দক্ষিণ চীন সাগর পর্যন্ত—সবখানেই এখন মার্কিন সামরিক উপস্থিতি প্রয়োজন। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে আগের মতো সর্বশক্তি নিয়োগ করা তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
  3. আঞ্চলিক শক্তির উত্থান: ১৯৫৬ সালের মিশরের তুলনায় বর্তমানের ইরান সামরিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী। তাদের উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক মিত্রদের (প্রক্সি নেটওয়ার্ক) কারণে আমেরিকা চাইলেই সরাসরি যুদ্ধে জয় নিশ্চিত করতে পারছে না।

ইসরাইল ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে প্রভাব

মিডলইস্ট আইয়ের বিশ্লেষণে আরও দাবি করা হয় যে, ইসরাইলের সামরিক আধিপত্য মূলত মার্কিন সমর্থনের ওপরই টিকে আছে। যদি হরমুজ সংকটের কারণে আমেরিকার প্রভাব কমে যায়, তবে ইসরাইলের নিরাপত্তাও গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়বে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পিছুটান শুরু হলে ইসরাইলের মতো রাষ্ট্রগুলো দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে হিমশিম খাবে, যা ফিলিস্তিন প্রশ্নে সম্পূর্ণ নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ও বহুমুখী বিশ্বের দিকে ধাবিত হওয়া

ইতিহাস সাক্ষী দেয় যে, কোনো সাম্রাজ্য একদিনে ধ্বংস হয় না। যখন কোনো শক্তির সামরিক ব্যয় তার রাজনৈতিক কৌশলের চেয়ে বেড়ে যায় এবং অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, তখনই তার পতনের সূচনা হয়। সুয়েজ খাল যেমন ব্রিটিশদের দম্ভ চূর্ণ করেছিল, হরমুজ প্রণালিও হয়তো মার্কিন একক আধিপত্যের অবসানের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কোনো নতুন একক শক্তির উত্থান নয়, বরং এই অঞ্চল এখন বহুমুখী শক্তির (Multipolar world) দিকে ধাবিত হচ্ছে, যেখানে আমেরিকার প্রভাব আগের তুলনায় সীমিত হয়ে আসবে।