হরমুজ প্রণালিতে ইরানের টোল আদায়: বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন সংকটের সৃষ্টি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আগ্রাসনের মুখে ইরান একটি কঠিন চাল দিয়েছে, বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করে। এই পদক্ষেপের ফলে বিশ্ববাজারে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে। ইরান এখন এই সমুদ্রপথে শত্রু রাষ্ট্রের নৌযান চলাচল বন্ধ করে দিয়ে টোল আদায় শুরু করেছে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
টোল আদায়ের প্রক্রিয়া ও আইনি কাঠামো
ইরানের পার্লামেন্ট হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে টোল বা শুল্ক আদায়ের জন্য একটি আইন পাসের চেষ্টা করছে। তসনিম ও ফার্স নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, পার্লামেন্টের সিভিল অ্যাফেয়ার্স কমিটির চেয়ারম্যান জানিয়েছেন যে একটি খসড়া আইন তৈরি করা হয়েছে এবং শিগগিরই তা ইসলামিক কনসালটেটিভ অ্যাসেম্বলির লিগ্যাল টিমের মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হবে।
একজন কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন, "এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে পার হওয়া জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ইরানকে অবশ্যই ফি বা শুল্ক আদায় করতে হবে। এটি খুবই স্বাভাবিক, অন্যান্য করিডোর বা স্থলপথের মতোই।"
তবে আইনি কাঠামো চূড়ান্ত হওয়ার আগেই ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) একটি ‘টোল বুথ’ ব্যবস্থা চালু করেছে বলে শিপিং জার্নাল ‘লয়েডস লিস্ট’ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদন অনুসারে, ইরান প্রতি জাহাজ থেকে দুই মিলিয়ন ডলার করে টোল আদায় করছে, যা জ্বালানিবাহী জাহাজগুলোর জন্য বিশাল আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
টোল আদায়ের কারণ ও প্রভাব
ইরানের আঞ্চলিক পানিসীমা হরমুজ প্রণালি পর্যন্ত বিস্তৃত, এবং গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আগ্রাসনের পর থেকে তারা এই পথ বন্ধ করে দিয়েছে। এই পদক্ষেপ বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের উপরে নিয়ে গেছে, যা যুদ্ধের আগের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো জ্বালানি রেশনিং করতে এবং শিল্প উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে।
টোল আদায়ের প্রক্রিয়াটি জটিল: জাহাজ অপারেটরদেরকে প্রথমে আইআরজিসির সঙ্গে যুক্ত মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয় এবং জাহাজের বিস্তারিত তথ্য জমা দিতে হয়। যদি জাহাজটি স্ক্রিনিংয়ে উত্তীর্ণ হয়, তবে আইআরজিসি একটি ক্লিয়ারেন্স কোড ও নির্দেশনা দেয়। প্রবেশের পর ইরানের বোট জাহাজটিকে পাহারা দিয়ে পার করে দেয়।
কোন দেশগুলো টোল পরিশোধ করছে?
ইরান দাবি করেছে যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো বাদে বাকি সবার জন্য হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত। লয়েডস লিস্টের তথ্যমতে, মালয়েশিয়া, চীন, মিশর, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারতের কিছু জাহাজকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অন্তত দুটি জাহাজ চীনের মুদ্রা ‘ইউয়ান’-এ টোল পরিশোধ করেছে, যদিও সঠিক পরিমাণ স্পষ্ট নয়।
ভারত সরকার অবশ্য দাবি করেছে যে তাদের পক্ষ থেকে ইরানকে কোনও অর্থ দেওয়া হয়নি। ভারতের বন্দর ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সচিব রাজেশ কুমার সিনহা বলেছেন, "প্রণালি দিয়ে চলাচলের জন্য কোনও অনুমতির প্রয়োজন নেই, সেখানে চলাচলের স্বাধীনতা রয়েছে।"
ভবিষ্যত সম্ভাবনা ও সতর্কতা
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে হরমুজ প্রণালিতে চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার পরও জ্বালানির দাম বাড়তে পারে, কারণ ইরানের এই টোল আদায় ব্যবস্থা বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পার হয়, তাই এটি ভূ-রাজনৈতিক দরকষাকষির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে প্রণালির আশেপাশে প্রায় ২ হাজার জাহাজ আটকা পড়ে আছে, যা ইরান, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে অবস্থিত। এই পরিস্থিতি বিশ্বব্যাপী জ্বালানি নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নতুন করে চিন্তা করতে বাধ্য করছে।



