ইরান হামলায় আরব-মুসলিম দেশগুলোর বৈঠকে মতভেদ: সৌদি, তুরস্ক ও পাকিস্তানের ভিন্ন অবস্থান
ইরান হামলায় আরব-মুসলিম বৈঠকে মতভেদ: সৌদি, তুরস্ক, পাকিস্তান

ইরান হামলায় আরব-মুসলিম দেশগুলোর বৈঠকে মতভেদের খবর

গত সপ্তাহে রিয়াদে অনুষ্ঠিত আরব ও মুসলিম দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষার কূটনৈতিক বিবৃতি নিয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মতভেদ দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে এই খবর নিশ্চিত করেছে। বৈঠকের সময় ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে সৌদি আরব লক্ষ্য করে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছিল, যার প্রতিবাদে রিয়াদ তেহরানের বিরুদ্ধে কঠোর নিন্দা প্রস্তাব চেয়েছিল।

তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রাথমিক অনিচ্ছা এবং অবস্থান পরিবর্তন

সংশ্লিষ্ট এক পশ্চিমা কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, শুরুতে তুরস্ক ও পাকিস্তান ইরানকে সরাসরি নিন্দা জানাতে রাজি ছিল না। তবে রিয়াদে বিদেশি কূটনীতিকদের বৈঠক চলাকালে মাথার ওপর দিয়ে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র উড়ে যেতে শুরু করলে তুরস্কের অবস্থান বদলে যায়। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিকে বলেন, "অন্তত যখন রিয়াদে কূটনীতিকরা এই সংকট সমাধানের পথ খুঁজছেন, তখন ইরানের উচিত ছিল হামলা বন্ধ রাখা।" তুরস্কের চাপের ফলেই শেষ পর্যন্ত যৌথ বিবৃতিতে ইসরায়েলের ‘সম্প্রসারণবাদী’ নীতির কঠোর সমালোচনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

গৃহীত বিবৃতির মূল বক্তব্য এবং সীমাবদ্ধতা

শেষ পর্যন্ত গৃহীত বিবৃতিতে বলা হয়, ইরানের এই হামলা "যেকোনও অজুহাতে বা যেকোনও রূপেই হোক না কেন, তা সমর্থনযোগ্য নয়"। দেশগুলোর আত্মরক্ষার অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে ইরানকে অবিলম্বে হামলা বন্ধ এবং আন্তর্জাতিক আইন ও প্রতিবেশীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরানকে আক্রমণ বন্ধ করতে বলা হলেও যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলকে তাদের হামলা বন্ধের জন্য বিবৃতিতে কোনও আহ্বান জানানো হয়নি। ইসরায়েলের সমালোচনা করা হয়েছে কেবল লেবাননে তাদের আগ্রাসনের জন্য, যা বৈঠকের ফলাফলের একটি স্পষ্ট সীমাবদ্ধতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দেশগুলোর ভিন্ন ভিন্ন অগ্রাধিকার এবং কৌশলগত অবস্থান

যুদ্ধের আগে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক একটি ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়ে আলোচনা করছিল, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশগুলোর ভিন্ন ভিন্ন অগ্রাধিকার সামনে চলে এসেছে। সৌদি আরব যদিও শুরুতে ইরানের ওপর মার্কিন হামলার বিরোধী ছিল, তবে এখন তারা হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ এবং নিজেদের তেল স্থাপনায় হামলা নিয়ে আতঙ্কিত। এ কারণে রিয়াদ এখন তাদের কয়েক দশকের পুরনো মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আরও বেশি নির্ভর করছে, সম্প্রতি সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহারের জন্য তায়েফের কিং ফাহাদ বিমানঘাঁটি খুলে দেওয়ায় এর প্রমাণ মিলেছে।

অন্যদিকে, ন্যাটো সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তুরস্ক হরমুজ প্রণালিকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য প্রধান স্তম্ভ হিসেবে মনে করে না, যা তাদের অবস্থানকে আলাদা করে তুলেছে। পাকিস্তানের অবস্থান কিছুটা ভিন্ন: ইরানের সঙ্গে তাদের স্থল সীমান্ত রয়েছে এবং পাকিস্তানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিয়া মুসলিম জনগোষ্ঠীর বসবাস, এ কারণে তেহরানের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষা ব্যবহারের বিষয়ে ইসলামাবাদ সতর্ক ভূমিকা নিয়েছে। তবে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে, যার ফলে অনেকে মনে করেন সৌদি আরব এখন পাকিস্তানের পারমাণবিক ছত্রছায়ায় রয়েছে, যদিও পাকিস্তান এই ধরনের প্রচারণার বিষয়ে কিছুটা সতর্ক অবস্থান বজায় রেখেছে।

পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

ইরানের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকায় পাকিস্তান এখন নিজেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরছে। গত মঙ্গলবার পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শাহবাজ শরিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সম্মত থাকলে পাকিস্তান এই সংঘাত নিরসনে একটি অর্থবহ আলোচনার আয়োজন করতে প্রস্তুত। উল্লেখযোগ্যভাবে, ডোনাল্ড ট্রাম্পও শাহবাজ শরিফের সেই পোস্ট শেয়ার করেছেন, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পাকিস্তানের এই ভূমিকার প্রতি মনোযোগ বাড়িয়েছে। এই বৈঠক এবং এর ফলাফল মধ্যপ্রাচ্যের জটিল কূটনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান বিভাজন এবং ভিন্ন কৌশলগত অগ্রাধিকারের প্রতিফলন হিসেবে দেখা যাচ্ছে।