পশ্চিম তীরে অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের ব্যাপক হামলা
ইসরায়েলি অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা গত সপ্তাহান্তে অধিকৃত পশ্চিম তীরজুড়ে ফিলিস্তিনিদের ওপর ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। এই হামলায় ঘরবাড়ি, গাড়ি, ক্লিনিক ও স্কুল লক্ষ্যবস্তু হয়েছে, যার ফলে বহু ফিলিস্তিনি আহত ও সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নাবলুস ও রামাল্লায় হামলার ঘটনা
গত রোববার গভীর রাতে নাবলুস ও রামাল্লার কাছে বেশ কিছু হামলার খবর পাওয়া গেছে। নাবলুসের পূর্বে দেইর আল-হাতাব শহরে সশস্ত্র অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালায়, যাতে অন্তত নয়জন আহত হন। তাঁদের মধ্যে একজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। রামাল্লার পূর্বে বুরকা শহরে অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা একটি ক্লিনিক ও একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।
জেনিন এলাকায় বড় আকারের হামলা
অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা সবচেয়ে বড় হামলা চালিয়েছে জেনিনের দক্ষিণে আল-ফান্দাকুমিয়া ও সিলাত আদ-ধাহর শহরে। হোয়েশ বসতি থেকে আসা লোকজন এই হামলায় অংশ নেয়। আল-ফান্দাকুমিয়াতে বেশ কিছু ফিলিস্তিনির ঘরবাড়ি ও যানবাহন পুড়িয়ে দেওয়া হয়, যাতে এক বাড়ির মালিক গুরুতর আহত হন। দুই শহর মিলিয়ে আরও ১০ জন সামান্য আহত হয়েছেন।
হুসাম আল-জুবি নামের একজনের ঘর পুরোপুরি পুড়ে গেছে। তিনি জানান, হামলাকারীরা জানালা ভেঙে পেট্রলবোমা ছুড়ে মেরেছে, যা সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। জুবি বলেন, গ্রামের এই হামলায় ২০০ শতাধিক অবৈধ বসতি স্থাপনকারী অংশ নিয়েছিল এবং এটি প্রায় ২০ মিনিট ধরে চলে।
সমন্বিত হামলা ও বর্ণবাদী স্লোগান
আল-ফান্দাকুমিয়াতে হামলার সময় আরও কয়েকটি গ্রামে প্রায় একই সময়ে একই ধরনের হামলা চালানো হয়। সিলাত আল-ধাহরে ১৫০ জনের বেশি অবৈধ বসতি স্থাপনকারী ফিলিস্তিনিদের বাড়িতে হামলা চালায়, গাড়িতে আগুন দেয়, জানালা ভাঙচুর করে ও দেয়ালে বর্ণবাদী স্লোগান লিখে রাখে। শহরের বাসিন্দা আদেল আবু আলী একে অত্যন্ত নৃশংস ও ‘খুন করার উদ্দেশ্যে’ হামলা হিসেবে বর্ণনা করেন।
আবু আলী যোগ করেন, ‘তারা বেশ কিছু বাড়ির জানালা ভেঙে ফেলে, যেখানে নারী ও শিশুরা ছিল। তারা ঘরের ভেতরে পেট্রলবোমা ছুড়ে মারে। আমাদের মনে হচ্ছিল, ২০১৫ সালে দুমায় যেভাবে দাওয়াবশাহ পরিবারকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল, আমাদের শহরেও তার পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছে।’
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ভূমিকা
হামলার প্রায় আধা ঘণ্টা পর বসতি স্থাপনকারীরা চলে গেলে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী শহরে ঢোকে। তবে তারা শহরের প্রধান প্রবেশপথ বন্ধ করে দেয়, ফলে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সময়মতো পৌঁছাতে পারেননি এবং আগুনের ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়া বাসিন্দাদের কাছে অ্যাম্বুলেন্স সময়মতো যেতে পারেনি। আবু আলী বলেন, ‘আমাদের শহরে এর আগে কখনো এত বড় আকারের হামলা হয়নি।’
অন্যান্য এলাকায় সহিংসতা
সহিংসতা নাবলুসের দক্ষিণে জালুদ ও কারিউত শহরেও ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনিদের বাড়ি ও গাড়িতে আগুন দিয়েছে। জালুদে ‘মেডিকেল রিলিফ সোসাইটি’ ভবনের একাংশ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অ্যাকটিভিস্ট বাশার আল-কারিউতি জানান, জালুদে পাঁচটি গাড়ি ও ক্লিনিকের একাংশ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং ১০টির বেশি বাড়ি ও দুটি গাড়ির জানালা ভাঙা হয়েছে।
এ ছাড়া নাবলুস ও রামাল্লার মধ্যবর্তী রাস্তায় চলাচলকারী বেশ কিছু ফিলিস্তিনি গাড়িতে পাথর ছোড়া হয়েছে। সড়কগুলোতে লাগাতার হামলার কারণে ফিলিস্তিনি লিয়াজোঁ অফিস বাসিন্দাদের এক শহর থেকে অন্য শহরে যাতায়াত যতটা সম্ভব কমিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছে।
হামলার পটভূমি
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বাড়লেও ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন শুরুর পর তা আরও চরম আকার ধারণ করেছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় অন্তত ছয়জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি পরিদর্শন করেছেন, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।



