ইরান যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার দাবি নাকচ করে, হামলা স্থগিতের ঘোষণা প্রত্যাখ্যান
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণা নাকচ করে দিয়েছে, যেখানে তিনি ইরানের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলা স্থগিত রাখার কথা বলেছেন। তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে কোনো ধরনের সংলাপ চলছে বলে ইরান অস্বীকার করেছে এবং ট্রাম্পের মন্তব্যকে জ্বালানির দাম কমানো ও সামরিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সময় ক্ষেপণের উদ্দেশ্য বলে অভিহিত করেছে।
ট্রাম্পের ঘোষণা ও ইরানের প্রতিক্রিয়া
ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একটি পোস্টে দাবি করেন যে, গত দুই দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে শত্রুতাপূর্ণ কর্মকাণ্ডের সমাধানে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। তিনি বলেন, এই আলোচনার প্রেক্ষিতে তিনি পাঁচ দিনের জন্য ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এই দাবি সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের পেছনে আসল উদ্দেশ্য হলো জ্বালানির দাম কমানো এবং তাঁর সামরিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সময় ক্ষেপণ করা।’ ইরান আরও উল্লেখ করে যে, উত্তেজনা কমাতে আঞ্চলিক দেশগুলোর কিছু উদ্যোগ রয়েছে, কিন্তু ওয়াশিংটনের সঙ্গেই যোগাযোগ করা উচিত, কারণ তারাই ‘এই যুদ্ধ শুরু করেছে’।
তেলের বাজারে প্রভাব
ট্রাম্পের ঘোষণার পরপরই বিশ্ব বাজারে তেলের দামে উল্লেখযোগ্য পতন দেখা যায়। ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার্সের দাম প্রতি ব্যারেল প্রায় ১০৪.১ ডলারে বেচাকেনা হয়, যা ৭.২ শতাংশ কম। একপর্যায়ে দাম ১৫ শতাংশ পড়ে প্রতি ব্যারেল ৯৬ ডলারে নেমে আসে। মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ৭.৮ শতাংশ কমে ৯০.৫৫ ডলারে দাঁড়ায় এবং সর্বনিম্ন ৮৫.২৮ ডলারে নামে, যেখানে সাড়ে ১৩ শতাংশ দরপতন হয়।
পূর্ববর্তী হুমকি ও পাল্টা হুমকি
এর আগে, ট্রাম্প বাংলাদেশ সময় গত রোববার ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটে হুমকি দিয়েছিলেন যে, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত না হলে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হবে। ইরান পাল্টা হুমকি দিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যের সব বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালানো হবে, বিশেষ করে যেসব জ্বালানি অবকাঠামোতে মার্কিন মালিকানা রয়েছে। তেহরান হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ এবং গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথে মাইন স্থাপনেরও হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে প্রণালিটি অনেকটা বন্ধ হয়ে গেছে।
ট্রাম্পের মিশ্র বার্তা ও বাজারের অস্থিরতা
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চলমান যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাবনা নিয়ে বারবার মিশ্র বার্তা দিয়ে আসছেন। এর আগে, অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১২০ ডলারের কাছাকাছি গেলে তিনি দ্রুত যুদ্ধ বন্ধের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, কিন্তু পরে সেই অবস্থান থেকে সরে এসে ‘সব লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত’ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। সম্প্রতি ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলা হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের বেশ কয়েকটি জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালায় ইরান, যার ফলে তেলের দাম আবার প্রতি ব্যারেল ১১৫ ডলারের কাছে গিয়ে ঠেকে।
এই পরিস্থিতিতে, ইরানের প্রত্যাখ্যান ও ট্রাম্পের ঘোষণার মধ্যে বিরোধ মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে, এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলছে।



