নওরোজে শোকের ছায়া: যুদ্ধের মাঝে ইরানিদের বর্ষবরণ
নওরোজে শোকের ছায়া: যুদ্ধে ইরানিদের বর্ষবরণ

নওরোজে শোকের ছায়া: যুদ্ধের মাঝে ইরানিদের বর্ষবরণ

বসন্তের আগমন ও নতুন বছরের সূচনার প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসে ফারসি উৎসব নওরোজ। কিন্তু ২০২৬ সালের ২০ মার্চ, ইরানের তেহরানে এই দিনটি ছিল শোকমিছিলের। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অব্যাহত হামলায় নিহত গোয়েন্দাবিষয়ক মন্ত্রী ইসমাইল খতিবকে বিদায় জানাতে জড়ো হয়েছিলেন শোকার্ত ইরানিরা। বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষ যখন নওরোজে মেতে ওঠে, তখন ইরানিরা বরণ করছেন যুদ্ধের বিভীষিকাময় এক নববর্ষ।

যুদ্ধের ছায়ায় নওরোজ উদযাপন

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরামহীন বোমাবর্ষণের কারণে ইরানে কয়েক হাজার মানুষ হতাহত হয়েছেন এবং দেশটির অবকাঠামোর বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে তেহরানের ৩৬ বছর বয়সী বাসিন্দা নাজনীন বলেন, ‘ফারসি ঐতিহ্য মেনে বসন্তের জন্য ঘরবাড়ি সাজানোর মতো কোনো শক্তি আমার অবশিষ্ট নেই।’ পরিবারের নিরাপত্তার খাতিরে নিজের পুরো নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি আরও যোগ করেন, ‘পরিবারের সবার সঙ্গে দেখা না হলে আমি কীভাবে উদযাপন করব? আমরা সবাই এখন আর এক জায়গায় মিলিত হতে পারছি না।’

হতাশা ও ভয়ের মধ্য দিয়ে সময়

নাজনীন এবং সিএনএনের সঙ্গে কথা বলা অন্য ইরানিদের কাছে গত তিন সপ্তাহ কেটেছে চরম হতাশা আর ভয়ের মধ্য দিয়ে। নাজনীন ব্যাখ্যা করেন, ‘সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে।... সময়ের স্বাভাবিক পরিক্রমায় “চাহারশাম্বে সুরি” কিংবা নওরোজ এলেও আমাদের কাছে সেগুলোর গুরুত্ব এখন খুব সামান্য।’ ফারসি নববর্ষ এবার ঈদুল ফিতরের সঙ্গে একই সময়ে উদযাপিত হতে যাচ্ছে, কিন্তু জাতি, ধর্ম বা বর্ণ-নির্বিশেষে অধিকাংশ ইরানির কাছে এই সংঘাতের সময়ে নওরোজ ভিন্ন ও বহুমুখী বার্তা নিয়ে এসেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

যুদ্ধ সত্ত্বেও বসন্তের আভাস

অবশ্য যুদ্ধ সত্ত্বেও তেহরানে নওরোজ উদযাপন একেবারে থেমে নেই। বাজারের দোকানগুলোয় প্রচুর পণ্য রয়েছে এবং গলিগুলোতে নওরোজের ঐতিহ্যবাহী ফুল ‘হায়াসিন্থ’-এর সুবাস ছড়িয়ে পড়েছে, যা শহরজুড়ে বসন্তের আগমনকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। ওয়াশিংটন ডিসিতে ইরানের একসময়কার দূতাবাসের বাইরে প্রবাসী ইরানিরা জড়ো হয়েছেন নওরোজ উদযাপনে। নতুন বছরকে ঘিরে নাজনীনের মতো কেউ কেউ হতাশায় ভুগলেও অন্যরা বসন্তের মধ্যে আশা খুঁজছেন।

আশা ও পুনর্জন্মের বার্তা

রাজধানীর দীর্ঘদিনের বাসিন্দা মেহরাদ বলেন, ‘যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মনে হচ্ছে, শহরটি যেন আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে, যদিও আমাদের ওপর বোমাবর্ষণ করা হচ্ছে। আবহাওয়া চমৎকার, আকাশ নীল এবং কুয়াশা কেটে গেছে। সব অর্থেই এটি নিখুঁত বসন্তের আবহাওয়া; যেন শহরটি জানে যে আমরা মুক্ত হতে যাচ্ছি।’ বিভক্ত এই সমাজে অনেক ইরানি এ বছরের নওরোজের বিশেষ তাৎপর্য দেখছেন, যার মূল সুর হলো শুদ্ধি আর পুনর্জন্ম।

অর্থনৈতিক সংকট ও উৎসবের দ্বন্দ্ব

৪৫ বছর বয়সী ইরানি নাগরিক আহমদ ও তাঁর স্ত্রী প্রতিবছরের মতো এবারও নওরোজ উদযাপনের পরিকল্পনা করছেন। আহমদ বলেন, ‘এসব ঐতিহ্য আমাদের সুখের মুহূর্ত। বছরের শেষ কয়েক মাসে আমরা অনেক মৃত্যু দেখেছি। তাই আমার মনে হয় জীবনকে সম্মান জানানো প্রয়োজন। উৎসবের এই সুযোগ তাদের কেড়ে নিতে দেওয়া ঠিক হবে না।’ তবে এ বছরের নওরোজ উদযাপন কেবল যুদ্ধের কারণেই ম্লান হয়নি। বর্তমান সংঘাত শুরু হওয়ার আগে থেকেই ইরান ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মোকাবিলা করছিল।

বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে উৎসবের প্রস্তুতি

তেহরানের এক বাসিন্দা জানান, তাঁরা নতুন বছর পালন করলেও ফুল কেনা বা ঐতিহ্যবাহী খাবার তৈরির পেছনে ব্যয়ের যৌক্তিকতা খুঁজে পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, ‘বাজারে পণ্যের অভাব নেই, কিন্তু আমার জন্য এখন পণ্যের স্বল্পতা কোনো সমস্যা নয়। তাজা ভেষজ, মাছ বা এমনকি ফুল কেনাও এখন বিলাসিতা; বিশেষ করে যখন সামনে কী হবে, তা নিয়ে আমাদের কোনো ধারণা নেই।’ ইরানের পাশাপাশি ইরাক, তুরস্ক, আজারবাইজান, তুর্কমিনিস্তান, আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান, পাকিস্তানসহ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন অঞ্চলেও নওরোজ পালিত হয়, যা ইউনেস্কোর তালিকাভুক্ত অন্যতম প্রাচীন উৎসব।