ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী লারিজানি নিহত, সামরিকীকরণের পথ প্রশস্ত
ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী লারিজানি নিহত হওয়ার ঘটনাটি দেশটির শাসনব্যবস্থার ওপর সামরিক বাহিনীর প্রভাব আরও শক্তিশালী হওয়ার পথ খুলে দিতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন। লারিজানি ইরানের কট্টরপন্থী সামরিক গোষ্ঠী এবং তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থী রাজনৈতিক অংশগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরিতে সক্ষম ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
যুদ্ধ-পরবর্তী সমঝোতার সম্ভাবনা কমে যাওয়া
জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের ইরানি নিরাপত্তাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ হামিদরেজা আজিজির মতে, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের মধ্যে সমঝোতা তৈরি করতে লারিজানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতেন। কিন্তু এখন এ ক্ষেত্রে সামরিকীকরণ হবে। আজিজি বলেন, ‘এখন মনে হচ্ছে সবকিছুই সামরিক উচ্চপদস্থদের হাতে চলে গেছে। যুদ্ধ থামাতে তারা কীভাবে নমনীয়তা দেখাবে বা কতটা নমনীয়তা দেখাতে পারবে, তা কল্পনা করাও কঠিন।’
লারিজানির ক্রমবর্ধমান দায়িত্ব ও ভূমিকা
গত কয়েক মাস ধরে লারিজানির দায়িত্ব ক্রমেই বেড়েছিল। জানুয়ারিতে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ওপর চালানো কঠোর দমন-পীড়ন তদারকের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। পাশাপাশি লারিজানি মিত্র দেশ ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত মোকাবিলায় ইরানকে প্রস্তুত করার কাজেও যুক্ত ছিলেন। তিনি ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
মধ্যপন্থী নেতা নিয়োগের পক্ষে মত
লারিজানি একজন রক্ষণশীল রাজনীতিক হলেও ক্রমশ কট্টরপন্থীদের প্রভাব বাড়তে থাকা শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে তুলনামূলক বাস্তববাদী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জায়গায় একজন মধ্যপন্থী সর্বোচ্চ নেতা নিয়োগের পক্ষে মত দিয়েছিলেন বলে সম্প্রতি দ্য নিউইয়র্ক টাইমস খবর প্রকাশ করেছিল। অবশ্য শেষ পর্যন্ত লারিজানির চাওয়া পূরণ হয়নি। আয়াতুল্লাহ খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকেই তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে।
ইরানি কর্মকর্তাদের উদ্বেগ ও আশঙ্কা
এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা ফোনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, লারিজানি নিহত হয়েছেন বলে তিনি ফোনে খবর পেয়েছেন। তাঁর মতে, এ ঘটনায় ইরানি কর্মকর্তারা যেমন গভীর আঘাত পেয়েছেন, তেমনি তাঁরা উদ্বেগের মধ্যেও আছেন। কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, ইসরায়েল ইরানের সব শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা না করা পর্যন্ত থামবে না এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে উৎখাত করবে।
সামরিক বাহিনীর প্রভাব বৃদ্ধির সম্ভাবনা
ইরানের বিপ্লবী গার্ডের এক সদস্য বলেছেন, লারিজানি ও বাসিজের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল গোলামরেজা সোলাইমানির হত্যাকাণ্ড সম্ভবত ইরানের কট্টরপন্থীদের ক্ষমতাকে আরও দৃঢ় করার সুযোগ করে দেবে। আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো আলী আলফোনেহ বলেছেন, এই হত্যাকাণ্ড ইরানি শাসকগোষ্ঠীকে আরও কট্টর করে তুলবে এবং ইরানের বিপ্লবী গার্ডকে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করবে।
রাজনৈতিক সমাধানের সুযোগ সংকুচিত
সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকা রক্ষণশীল ইরানি রাজনীতি-বিশ্লেষক হাতেফ সালেহির মতে, লারিজানি ইরানের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সক্ষম মধ্যস্থতাকারী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি মারা যাওয়ায় এখন যুদ্ধ থামাতে কম খরচায় রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করার সুযোগ কমে যাবে। টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাইদ গোলকার বলেন, লারিজানির মৃত্যুর কারণে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফকে আরও উচ্চপর্যায়ের দায়িত্ব সামলাতে হবে, যিনি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে রয়েছেন।



