উপসাগরীয় দেশগুলোর ক্ষোভ তেহরানের দিকে, যুদ্ধে জনজীবনে অদ্ভুত পরিবর্তন
ইরান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে চলমান যুদ্ধের দ্বিতীয় সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোর জনজীবনে এক অদ্ভুত ও উদ্বেগজনক পরিবর্তন এসেছে। একদিকে যুদ্ধের দামামা, অন্যদিকে প্রাত্যহিক জীবনের প্রয়োজনীয়তা—এই দুইয়ের মধ্যে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন এই অঞ্চলের বাসিন্দারা।
প্রাত্যহিক জীবনে যুদ্ধের প্রভাব
উপসাগরীয় দেশগুলোর বড় শহরগুলোতে এখন প্রতিদিনের চিত্রটি এমন যে, দোহায় ইফতার পরবর্তী জিম ক্লাশে যখন প্রশিক্ষক ‘ইতিবাচক শক্তি’র কথা বলছেন, তখনই স্মার্টফোনে বেজে উঠছে মিসাইল অ্যালার্ট। কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে রমজানের ঐতিহ্যবাহী কামানের গোলা দাগানো বন্ধ রাখা হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষ সেটিকে বোমার শব্দ ভেবে আতঙ্কিত না হয়।
ড্রোন ও মিসাইল প্রতিহতের জন্য জ্যামার ব্যবহারের ফলে গুগল ম্যাপস ব্যাপকভাবে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। ডেলিভারি চালকরা মাঝেমধ্যেই নিজেদের অবস্থান সমুদ্রের মাঝখানে বা মরুভূমিতে দেখতে পাচ্ছেন। বাসিন্দাদের নিরবচ্ছিন্ন ঘুমের সুবিধার্থে সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ রাতে মোবাইল ফোনের ইমার্জেন্সি অ্যালার্টের শব্দ কমিয়ে রাখার নির্দেশনা দিয়েছে।
ক্ষোভের লক্ষ্য তেহরান কেন?
একটি বড় যুদ্ধের আশঙ্কায় উপসাগরীয় দেশগুলো আগে থেকেই আমেরিকাকে সতর্ক করেছিল। তা সত্ত্বেও যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই দেশগুলোর জনরোষ ওয়াশিংটনের পরিবর্তে তেহরানের দিকেই বেশি। এর প্রধান কারণগুলো হলো:
- তেহরানের ‘বিশ্বাসঘাতকতা’: কাতার ও আমিরাত বারবার তেহরানকে আশ্বস্ত করেছিল যে তাদের ভূমি ব্যবহার করে ইরানের ওপর হামলা হবে না। কিন্তু যুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই ইরান এই দেশগুলোর ওপর আক্রমণ শুরু করে, যা দোহা ও দুবাই ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে দেখছে।
- কূটনৈতিক ব্যর্থতা: কাতারের প্রধানমন্ত্রীর মতে, তারা বছরের পর বছর ধরে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু ইরানের ‘ভুল হিসাব’ সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছে।
- আরামকোর সতর্কতা: সৌদি আরামকোর সিইও আমিন নাসের সতর্ক করেছেন যে, জ্বালানি অবকাঠামোতে ক্রমাগত হামলা বিশ্ব তেল বাজারে ‘বিপর্যয়কর’ প্রভাব ফেলতে পারে।
নিরাপত্তা কৌশলে বড় পরিবর্তন
এই যুদ্ধের ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা গ্রহণ করছে—কেবল একটি দেশের (যুক্তরাষ্ট্র) ওপর নির্ভর করা নিরাপদ নয়। ফলে তারা এখন তাদের নিরাপত্তা সহযোগীদের তালিকায় বৈচিত্র্য আনছে। বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আকাশে ফ্রান্সের রাফাল এবং কাতারের আকাশে ব্রিটেনের টাইফুন যুদ্ধবিমান পাহারায় নিয়োজিত আছে।
সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, তারা ওয়াশিংটনকে ত্যাগ করবেন না, তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চীন, তুরস্ক, ভারত, পাকিস্তান এমনকি ইসরাইলের সঙ্গেও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও মজবুত করার দিকে ঝুঁকছেন। যুদ্ধের দুই সপ্তাহ পার হলেও মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট কবে থামবে, তা নিয়ে এখনও গভীর অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।
সূত্র: দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন
