ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির নীরবতা: আহত হওয়ার শঙ্কা ও বিপ্লবী গার্ডের প্রভাব
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা আলী খামেনিকে নির্বাচন করা হয়েছে দুই দিনের বেশি সময় ধরে, কিন্তু তিনি এখনো কোনো বিবৃতি দেননি। এই নীরবতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের ছেলে ইউসুফ পেজেশকিয়ান তাঁর টেলিগ্রাম চ্যানেলে জানিয়েছেন যে, মোজতবা আলী সম্ভবত ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার দিনে আহত হয়েছেন। তবে তিনি নিরাপদে আছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিপ্লবী গার্ডের চাপ ও নিয়োগ প্রক্রিয়া
ইরানের প্রভাবশালী বিপ্লবী গার্ড মোজতবা খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ দিতে চাপ দিয়েছে, যা জ্যেষ্ঠ কয়েকটি সূত্রের বরাতে নিশ্চিত হয়েছে। সূত্রগুলো বলছে, বিপ্লবী গার্ড মোজতবা খামেনিকে তাঁর বাবার তুলনায় অধিক নমনীয় হিসেবে দেখছে, যিনি তাদের কঠোর নীতি সমর্থন করবেন। এই প্রক্রিয়ায় বাস্তববাদীদের উদ্বেগকে জোরপূর্বক উপেক্ষা করা হয়েছে।
ইরানে বিপ্লবী গার্ড আগে থেকেই প্রভাবশালী ছিল, এবং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন শুরুর পর এই বাহিনী আরও বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন নিয়ে ইরানের জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাদের ভেতর সংশয় তৈরি হয়েছিল, যে কারণে ঘোষণা আসতে কয়েক ঘণ্টা বিলম্ব হয়। বিপ্লবী গার্ড দ্রুত সেই সংশয় দূর করে নতুন সর্বোচ্চ নেতা কে হবেন, তা ঠিক করে ফেলে।
নীরবতার কারণ ও উদ্বেগ
নতুন সর্বোচ্চ নেতার নাম ঘোষণার পর গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পার হয়ে গেছে, কিন্তু মোজতবা খামেনি এখনো কোনো বিবৃতি দেননি। যাঁরা তাঁকে সর্বোচ্চ নেতা করা নিয়ে সংশয়ে ছিলেন, এটা তাঁদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বাবার হত্যাকাণ্ডের পর নিরাপত্তা শঙ্কাও মোজতবার নীরব থাকার সম্ভাব্য একটি কারণ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরানের ৮৮ সদস্যের ‘এক্সপার্টস অ্যাসেম্বলি’ গত রোববার মোজতবাকে দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করেছে। ইরানের সর্বময় ক্ষমতা স্পষ্টভাবে দেশটির বিপ্লবী গার্ড এবং সর্বোচ্চ নেতার হাতে, যেখানে সরকারি প্রশাসনের সমান্তরালে তাদের একটি প্রভাবশালী দেশ পরিচালনা ব্যবস্থা রয়েছে।
বিপ্লবী গার্ডের প্রভাব ও ভবিষ্যৎ নীতি
বিপ্লবী গার্ডের পরিকল্পনায় মোজতবা খামেনিকে নির্বাচন ইরানকে আরও আগ্রাসী বৈদেশিক নীতি গ্রহণ এবং অভ্যন্তরে আরও কঠোর দমন নীতি প্রয়োগের দিকে নিয়ে যেতে পারে—এমনটাই বলেছেন তিন জ্যেষ্ঠ ইরানি সূত্র। এই তিন সূত্রের মধ্যে দুটি বলছে, তাদের আশঙ্কা, বিপ্লবী গার্ডের প্রভাবশালী অবস্থান ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে আরও বেশি সামরিক রাষ্ট্রে পরিণত করবে, যেখানে ধর্মীয় ন্যায়বিচারের সঙ্গে তাদের কেবল নামমাত্র সম্পর্ক থাকবে।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর তিন সদস্যের একটি কমিটি ইরানের শাসন ভার গ্রহণ করেছিল, যার মধ্যে মাসুদ পেজেশকিয়ানও ছিলেন। উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে ক্ষমা চাওয়ার কারণে পরে তাঁকে পিছিয়ে যেতে হয়। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে সূত্রগুলো বলেছে, ক্ষমা চাওয়ার কারণে পেজেশকিয়ানের ওপর বিপ্লবী গার্ডের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ক্ষুব্ধ ছিলেন।
তিনটি সূত্রের মধ্যে একটি সূত্র বলেছিল, বিপ্লবী গার্ড এখন ইরান পরিচালনা করছে। প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বিপ্লবী গার্ডকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম ছিলেন, কিন্তু নতুন নেতার সক্ষমতা থাকলেও বড় বড় বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হয়তো বিপ্লবী গার্ডের হাতেই থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওয়াশিংটন ডিসির মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো অ্যালেক্স ভাটানকা বলেন, ‘মোজতবা তাঁর সর্বোচ্চ নেতার পদে আসীন হতে পারার জন্য বিপ্লবী গার্ডের কাছে ঋণী, এ জন্য তিনি তাঁর বাবার মতো সর্বোচ্চ ক্ষমতাশালী হবেন না।’



