ইরানের শীর্ষ উপদেষ্টা কামাল খারাজির হুঁশিয়ারি: যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত, কূটনৈতিক সমাধান নাকচ
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য ইরান সরকার পুরোপুরি প্রস্তুত বলে দাবি করেছেন দেশটির শীর্ষস্থানীয় একজন কর্মকর্তা। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর ওপর হামলা চালিয়ে যেতে চায়, যাতে তারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সংঘাত থেকে সরে আসতে রাজি করানোর চেষ্টা চালায়।
কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা নাকচ
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা কামাল খারাজি সোমবার তেহরানে বসে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন। তিনি এই মুহূর্তে কূটনৈতিকভাবে এই সংকট সমাধানের সম্ভাবনা সম্পূর্ণভাবে নাকচ করেছেন। খারাজি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘আমি কূটনীতির আর কোনো সুযোগ দেখি না। কারণ, ডোনাল্ড ট্রাম্প অন্যদের প্রতারিত করেছেন এবং নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছেন না। দুই দফা সমঝোতা আলোচনার সময় আমাদের এই অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমরা যখন আলোচনায় যুক্ত ছিলাম, তখনই তারা আমাদের ওপর আঘাত হেনেছে।’
তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, এই যুদ্ধ কেবল অর্থনৈতিক সংকটের মাধ্যমেই শেষ হতে পারে। এর মধ্য দিয়ে যুদ্ধের দশম দিনে ইরান সরকারের অবস্থান আরও কঠোর হওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ হওয়ার ইঙ্গিত
কামাল খারাজি তাঁর বক্তব্যে ব্যাখ্যা করেছেন, ‘এই যুদ্ধ অন্যদের ওপর ব্যাপক চাপ-অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছে। মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি-সংকট ব্যাপক অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছে এবং এটা চলতে থাকবে। যুদ্ধ চলতে থাকলে চাপের মাত্রা আরও বাড়বে। তখন অন্যদের হস্তক্ষেপ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।’
ইরানের এই শীর্ষ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘ততক্ষণ পর্যন্ত আলোচনার সুযোগ নেই, যতক্ষণ না অর্থনৈতিক চাপ এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে অন্য দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসন বন্ধের নিশ্চয়তার জন্য হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়।’ তাঁর বক্তব্যের ইঙ্গিত হলো, যুদ্ধ বন্ধ করতে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর হামলা অব্যাহত
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে একের পর এক হামলা চালিয়েছে। তেহরানের দাবি, তারা উপসাগরীয় দেশগুলোতে মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। তবে আবাসিক ভবন এবং বিভিন্ন বিমানবন্দরও বারবার হামলার শিকার হয়েছে।
ইরানের এসব হামলায় বিশ্ব জ্বালানি-বাণিজ্যের দুর্বলতাগুলো সামনে এসেছে, যার মধ্যে অবকাঠামোগত দুর্বলতার পাশাপাশি পরিবহন পথসহ অন্যান্য দুর্বলতা রয়েছে। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌ-চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। সোমবার অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা সাধারণ মানুষের পকেট ও শেয়ারবাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে।
জ্বালানি বাজারে ব্যাপক প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান র্যাপিডান এনার্জি গ্রুপের পরিসংখ্যান বলছে, চলমান এই সংঘাতের ফলে বিশ্বের আনুমানিক ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। ১৯৫৬-৫৭ সালের সুয়েজ খাল সংকটের সময়ের রেকর্ডের তুলনায় এটি প্রায় দ্বিগুণ।
এই যুদ্ধে কেবল অঞ্চলটি থেকে তেল সরবরাহই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে না, বরং এটি জ্বালানি বাজারের আপৎকালীন বাড়তি উৎপাদন সক্ষমতা বা স্পেয়ার ক্যাপাসিটিকেও কার্যত নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। এই সক্ষমতা সাধারণত জ্বালানি বাজারে বড় কোনো ধাক্কা সামলাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। প্রয়োজনের সময় ঠিক কত দ্রুত অতিরিক্ত তেল উৎপাদন শুরু করা সম্ভব, তা এই সক্ষমতা দিয়ে পরিমাপ করা হয়।
নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি
এদিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতার নাম ঘোষণা করেছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় নিহত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দ্বিতীয় পুত্র মোজতবা খামেনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। এটার স্পষ্ট ইঙ্গিত হলো, সংঘাত আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
ইরানের সামরিক বাহিনী ও সর্বোচ্চ নেতৃত্ব আগামী দিনগুলোতে একই মনোভাব নিয়ে এগোবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে খারাজি বলেন, ‘হ্যাঁ, ঠিক তাই।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার নেতৃত্ব দেওয়া ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নেতার দায়িত্ব। তাই প্রয়াত আয়াতুল্লাহ খামেনি এত দিন যেভাবে সেই দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন, নতুন নেতাও তা একইভাবে পালন করবেন।’
গত সপ্তাহে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, পিতার উত্তরসূরি হিসেবে মোজতবা খামেনির নিয়োগ তাঁর কাছে ‘অগ্রহণযোগ্য’। এ প্রসঙ্গে খারাজি বলেন, ‘এটি তাঁর (ট্রাম্পের) বিষয় নয়।’
ইরানের রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) একজন মুখপাত্র রোববার জানিয়েছেন, তেহরান এই অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটি ও ‘কৌশলগত স্বার্থের’ ওপর হামলা চালাতে তাদের সামরিক সক্ষমতার ৬০ শতাংশ ব্যবহার করছে। এই তথ্য ইরানের সামরিক প্রস্তুতির মাত্রা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেয়।
