সৌদি আরবে ড্রোন হামলার পর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে যুদ্ধ জড়ানোর প্রশ্ন
সৌদি আরবে হামলায় পাকিস্তানের যুদ্ধ জড়ানোর প্রশ্ন

সৌদি আরবে ড্রোন হামলার পর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে যুদ্ধ জড়ানোর প্রশ্ন

সৌদি আরবে সংঘটিত একটি আত্মঘাতী ড্রোন হামলা মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধে পাকিস্তানকেও জড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের সঙ্গে করা প্রতিরক্ষা চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্তান কি সত্যিই যুদ্ধে অংশ নেবে—এ প্রশ্নটি এখন আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

চুক্তির শর্ত ও পাকিস্তানের অবস্থান

ওই চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, দুই দেশের যে কোনো একটির ওপর হামলাকে উভয়ের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। পাকিস্তানের অবস্থান নিয়ে কিছুটা ধারণা পাওয়া গেছে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সাম্প্রতিক মন্তব্য থেকে। তিনি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে সৌদি আরবে হামলা না করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে।

গত মঙ্গলবার তিনি স্পষ্টভাবে জানান, ইরান যদি সৌদি আরবে হামলা অব্যাহত রাখে, তাহলে ইসলামাবাদ চুক্তির বাধ্যবাধকতার মুখে পড়তে পারে। তবে এখন পর্যন্ত পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কেবল সতর্কবার্তা দিয়েছেন, সৌদি আরবের হয়ে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেননি।

বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন

বেশিরভাগ বিশ্লেষক মনে করেন, পাকিস্তান এই মুহূর্তে সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তুলনামূলকভাবে কম। বরং দেশটি রাজনৈতিকভাবে সৌদি আরবের কূটনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরাইল কাতারের রাজধানী দোহায় বিমান হামলা চালানোর পর উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা দিতে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। এরপরই রিয়াদ বিকল্প নিরাপত্তা অংশীদার খোঁজার দিকে ঝুঁকতে থাকে।

পারমাণবিক বিতর্ক ও আন্তর্জাতিক প্রভাব

এই চুক্তি নিয়ে আরেকটি বড় বিতর্ক রয়েছে পারমাণবিক অস্ত্র সংক্রান্ত। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এসএমডিএ চুক্তি পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) এবং জাতিসংঘের পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ চুক্তির (টিপিএনডব্লিউ) মূল নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। পাকিস্তান এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে বলেনি যে তারা সৌদি আরবকে পারমাণবিক সুরক্ষা দিচ্ছে। কিন্তু বিভিন্ন বিশ্লেষণ ও মন্তব্যের কারণে প্রশ্ন উঠেছে—পাকিস্তান কি প্রথমবারের মতো কোনো পারমাণবিক অস্ত্রবিহীন মিত্র রাষ্ট্রকে পারমাণবিক সুরক্ষার আওতায় এনেছে?

পারমাণবিক অস্ত্র বিলোপের পক্ষে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংগঠন আইক্যানের এক প্রতিবেদনে লন্ডনভিত্তিক থিংকট্যাংক চ্যাথাম হাউজের বিশ্লেষকদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, এই চুক্তি পারমাণবিক অস্ত্রধারী পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এনপিটি কাঠামোর বাইরে ‘বর্ধিত প্রতিরোধ নীতি’র একটি নতুন নজির তৈরি করতে পারে। যদিও চুক্তি দলিলে সরাসরি পারমাণবিক অস্ত্রের উল্লেখ নেই।

আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ

গত বছর ১৭ সেপ্টেম্বর সই হওয়া এই চুক্তির লক্ষ্য ছিল দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানো এবং ‘যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিরোধ শক্তিশালী করা।’ চুক্তির সময় উভয় দেশ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করেছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসলামাবাদের জন্য কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রতিবেশী আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনার মধ্যেই চরম উৎকণ্ঠায় সময় পার করছেন পাকিস্তান। ইরান ও পাকিস্তানের সম্পর্কও দীর্ঘদিন ধরে জটিল। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা তীব্র হয়েছিল।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসলামাবাদ কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করবে, নাকি সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়বে—সেটিই এখন আন্তর্জাতিক মহলের কাছে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পাকিস্তান একইসাথে আফগানিস্তান সীমান্তে উত্তেজনা এবং সৌদি আরবের সঙ্গে চুক্তির বাধ্যবাধকতার মধ্যে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার মুখোমুখি হয়েছে।