আজ ৫ জুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবস। ১৯৭২ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে সুইডেনের স্টকহোমে মানব পরিবেশ সম্মেলনের পর ১৯৭৩ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দিবসটি পালন শুরু হয়। মূল উদ্দেশ্য ছিল পরিবেশ রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা এবং পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখার আহ্বান জানানো।
পরিবেশ কি শুধু এক দিনের বিষয়?
না, বরং এটি মানুষের প্রতিদিনের জীবন, প্রতিটি নিশ্বাস, প্রতিটি অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। আমরা যে বিশুদ্ধ বাতাস, নিরাপদ পানি, বৃষ্টি, ছায়া, খাদ্য গ্রহণ করি—সবই আসে প্রকৃতি থেকে। তাই পরিবেশ রক্ষা কেবল একটি দিবসের আনুষ্ঠানিকতা হতে পারে না; এটি হওয়া উচিত প্রতিদিনের দায়িত্ব ও সচেতনতার অংশ।
তাহলে কেন এই দিবস?
মানুষ প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। প্রকৃতি ছাড়া মানবসভ্যতার অস্তিত্ব অসম্ভব। এই দিবস আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। স্মরণ করিয়ে দেয় দায়িত্বের কথা। প্রশ্ন তোলে মানবিকতার আমরা কতটা সচেতন। গাছ লাগানো কর্মসূচি, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, সচেতনতামূলক সভা কিংবা র্যালি—এসব কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং মানুষকে সচেতন করার এক সামাজিক প্রচেষ্টা মাত্র।
কিন্তু আমরা কি সত্যিই সচেতন?
না। যদি সত্যিই সচেতন হতাম, তাহলে আজ শহরের বাতাস বিষাক্ত হতো না, নদী-খাল দখল হতো না, দূষিত হতো না, কালো রং ছড়িয়ে যেত না, বনভূমি উজাড় হতো না। ঈদুল আজহায় কোরবানির পশু জবাইয়ের পর রক্ত পুঁতে না রেখে বা পানি না দিয়ে ওভাবে রেখে দেওয়ার কারণে চারপাশে গন্ধ ছড়াত না। এসব বন্ধে দরকার সচেতনতা। কিন্তু সমাজের মানুষ হলো উদাসীন। তারা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর, নিজের ও চারপাশের মানুষের ক্ষতির কথাটি জানার পরও সচেতন হচ্ছে না।
শিল্পকারখানার কালো ধোঁয়া, যানবাহনের বিষাক্ত গ্যাস, বনভূমি উজাড়, নদী দখল, প্লাস্টিক দূষণ এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে পৃথিবীর স্বাভাবিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতিনিয়ত বায়ুমণ্ডলে বাড়ছে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ। ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে আবহাওয়ার ওপর। মানুষের জীবনকে সহজ থেকে জটিলে রূপান্তর করে তুলছে।
পরিবেশবিদদের বক্তব্য
পরিবেশবিদেরা বলছেন, এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী মানুষ নিজেই। যদিও মানুষ বুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণী বলে নিজেদের দাবি করে। প্রশ্ন ওঠে তারা কতটা বুদ্ধিসম্পন্ন? যেখানে শুধু নিজের স্বার্থের কথা ভাবে এবং কাজ করে। নিজের স্বার্থে ভোগ-বিলাসের জন্য বন কেটে নগর গড়ে তোলা, নদী দখল, পাহাড় ধ্বংস এবং প্রকৃতির সম্পদের অপচয় করতে এক মূহর্ত ভাবে না। যেখানে প্রত্যেক মানুষের কর্তব্য ছিল—একটি গাছ কাটলে নতুন করে তিনটি গাছ রোপণ করা।
একসময় প্রকৃতির নিজস্ব ছন্দ ছিল। ঋতু পরিবর্তন হতো নিয়ম মেনে। আষাঢ়ে মুষলধারে বৃষ্টি, শীতে কুয়াশা আর গাছের পাতা ঝরে পড়ত, বসন্তে গাছে নতুন ও বিভিন্ন রকমের ফুল। কিন্তু আজ প্রকৃতি যেন ফিকে হয়ে গেছে। স্বাভাবিক অবস্থা থেকে সরে এসে ক্রমেই অস্বাভাবিকে রূপান্তর। কখনো দীর্ঘ খরা, অতিবৃষ্টি, কখনো আবার তীব্র শীত বা তাপপ্রবাহ আবার কখনো আকস্মিক ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের প্রকাশিত খবর ও জাতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শীত মৌসুমে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রার সরকারি রেকর্ড ৬.৭°সেলসিয়াস, নওগাঁর বদলগাছীতে, ৭ জানুয়ারি। গরমের সময় ২০২৬ সালে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪০°সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে রাজশাহীতে, ২২ এপ্রিল।
বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। এ দেশের অর্থনীতি, খাদ্য উৎপাদন এবং কোটি মানুষের জীবিকা সরাসরি প্রকৃতি ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। কৃষকের কাছে সময়মতো বৃষ্টি যেমন আশীর্বাদ, তেমনি প্রয়োজন অনুযায়ী রোদও ফসলের সুস্থ বৃদ্ধি ও পরিপক্বতার জন্য অপরিহার্য। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতার কারণে সেই স্বাভাবিক ঋতুচক্র ক্রমেই অনিয়মিত হয়ে উঠছে। দেখা যাচ্ছে যখন জমিতে বৃষ্টির প্রয়োজন তখন আকাশ থাকে রোদে ঝলমলে, আবার ফসল কাটার মৌসুমে শুরু হয় টানা বৃষ্টিপাত। কখনো দীর্ঘ খরা, কখনো অতিবৃষ্টি কৃষকের পরিশ্রমকে মুহূর্তেই মাটিতে মিশিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, কৃষক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন এবং দেশের খাদ্যনিরাপত্তাও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
পরিবেশের পরিবর্তনের প্রভাব
পরিবেশের এই অস্বাভাবিক পরিবর্তন শুধু প্রকৃতির ভারসাম্যকেই নষ্ট করছে না; বরং মানুষের জীবন, জীবিকা, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎকেও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সব মিলিয়ে প্রকৃতির মধ্যে চলছে এক নীরব কিন্তু ভয়াবহ পরিবর্তন, যার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ মানুষের অসচেতনতা ও উদাসীনতা।
প্রকৃতির এই পরিবর্তন মানুষের সহজ–সরল জীবনকে কঠিন করে তুলছে। অবশ্যই, এর জন্য দায়ী মানুষ। হয়তো আমরা তখনই পুরোপুরি সচেতন হব, যখন পরিবেশের ভয়াবহতা সরাসরি আমাদের জীবনে আঘাত হানবে; যখন বিশুদ্ধ বাতাস বিলাসিতা হয়ে যাবে, নিরাপদ পানি সংকটে পরিণত হবে কিংবা প্রকৃতির প্রতিশোধে মানবজীবন বিপর্যস্ত হয়ে উঠবে।
ছোট পদক্ষেপে বড় পরিবর্তন
বাস্তবতা হলো পরিবেশ রক্ষার আলোচনা যতটা বাড়ছে, সমান তালে বাস্তবে সচেতনতার চর্চা ততটা বাড়ছে না। এই জন্য দরকার সচেতনতা প্রত্যেকের। যেমন একটি গাছ কাটলে এর পরিবর্তে তিনটি গাছ লাগানো। অর্থাৎ পরিবর্তন আনতে বড় কোনো উদ্যোগের প্রয়োজন নেই; ছোট ছোট সচেতন পদক্ষেপই বড় পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে পারে। একটি গাছ লাগানো, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, বর্জ্য যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা করা কিংবা চারপাশ পরিষ্কার রাখা—এসব উদ্যোগ পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রকৃতি মানুষের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং মানুষ সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। তাই পরিবেশ রক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার পূর্বশর্ত। আজ প্রকৃতি বিভিন্নভাবে মানুষকে সতর্ক করছে; অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘ খরা, তীব্র তাপপ্রবাহ, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মাধ্যমে। কিন্তু সেই সতর্কবার্তা আমরা কতটা বুঝতে পারছি, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
আসুন, উদাসীনতা পরিহার করে সচেতন হই। পরিবেশ বাঁচাই, সবুজ পৃথিবী গড়ি। একটি দিনকে নয়, বরং প্রতিটি দিনকে উদ্যাপন করি। পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখি, নিজে বাঁচি, অন্যকে বাঁচার সুযোগ করি। নতুন পরিবেশ গড়ি, সুন্দর–সমৃদ্ধ ও মঙ্গলময় পৃথিবী গড়ি, নিরাপদ ভাবে জীবন যাপন করি।



